চাষের খরচ কমবে! কৃষি যান্ত্রিকীকরণে রেকর্ড ৪০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করল রাজ্য সরকার

গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কৃষিকাজকে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করে তুলতে এক ঐতিহাসিক ও বড়সড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। একইসঙ্গে গ্রামীণ যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে মাথায় রাখা হয়েছে। এই জোড়া লক্ষ্য পূরণে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ‘কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’-এ রেকর্ড পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করেছে রাজ্যের কৃষি দফতর। চলতি অর্থবর্ষে এই প্রকল্পে মোট ৪০৭ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে, যা এযাবৎকালের মধ্যে সর্বাধিক।
রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল এ প্রসঙ্গে জানান, “গত কয়েক বছর ধরে সরকার কৃষিকাজে প্রযুক্তির উন্নতি সাধনের জন্য আর্থিক ব্যবস্থা অনেকটা বাড়িয়েছে। বিগত ২৩-২৪ অর্থবর্ষে আমাদের এই প্রকল্পে ১ কোটি ১৪ লক্ষ টাকা ছিল, যা এ বছর বাড়িয়ে সরাসরি ৪০৭ কোটি টাকা ভর্তুকি করা হয়েছে।”
ফার্ম মেশিনারি ব্যাংক ও সিএইচসি গঠন
কৃষি দফতরের নতুন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ৫০০টি কৃষি যন্ত্রপাতি ভাড়া কেন্দ্র (CHC) এবং ১০০০-এর বেশি ফার্ম মেশিনারি ব্যাংক বা হাব গড়ে তোলা হবে। চাষের কাজে প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে ১০০টি অত্যাধুনিক কৃষি ড্রোন বিতরণেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬৮ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। পাশাপাশি, চিরাচরিত শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের বিকল্প ও সবুজ শক্তিতে উৎসাহিত করতে রাজ্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৫০০টি সোলার পাম্পসেট বসানোর বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তার পরিমাণ:
বড় যন্ত্রপাতি: পাওয়ার টিলার, উইডার, রিপার, মাল্টিক্রপ থ্রেশার বা ট্রাক্টর চালিত যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে দামের ৫০ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি মিলবে। সোলার পাম্পসেটের ক্ষেত্রে এই ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা হয়েছে।
ছোট যন্ত্রপাতি: হস্তচালিত বা পদচালিত ছোট যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও ৫০ শতাংশ বা সর্বাধিক ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এককালীন আর্থিক সহায়তা পাবেন কৃষকরা।
ফার্ম মেশিনারি ব্যাংক: এই হাব তৈরির জন্য ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রজেক্ট মূল্যের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ হারে সরকারি অনুদান দেওয়া হবে। কৃষিমন্ত্রীর কথায়, “মাত্র ২ লক্ষ টাকা দিয়ে ৮ লক্ষ টাকার সাবসিডি অ্যাচিভ করে একটি ট্রাক্টর নিতে পারবেন বেকার যুবকরা, বাকি সাবসিডিটা সরকার ও ব্যাংক ঋণ হিসেবে মিলবে।”
কারা প্রকল্পের সুবিধা পাবেন এবং আবেদনের নিয়ম কী?
এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত বেঁধে দিয়েছে কৃষি দফতর—
আবেদনকারীকে অবশ্যই ‘কৃষকবন্ধু (নতুন)’ বা ‘পিএম কিষাণ সম্মান নিধি’ প্রকল্পে নথিভুক্ত থাকতে হবে।
আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং তিনি সরকারি বা আধা-সরকারি কর্মচারী হতে পারবেন না।
পাওয়ার টিলার ও সোলার পাম্পের ক্ষেত্রে কৃষকের নিজের নামে অন্তত আধ একর কৃষিজমির খতিয়ান বা পরচা থাকা বাধ্যতামূলক।
বিগত চার বছরে যাঁদের পরিবার এই সুবিধা পাননি, তাঁরাই নতুন করে আবেদন করতে পারবেন।
পুরো আবেদন প্রক্রিয়াই সম্পূর্ণ অনলাইনে সম্পন্ন হবে। ইতিমধ্যে ৬ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ১১টা থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাজ্য সরকারের কৃষি দফতরের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করা যাবে। অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি সমস্ত নথিপত্র-সহ ৬ নভেম্বরের মধ্যে ব্লক বা জেলাস্তরের সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা দিতে হবে।
সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখার বার্তা
পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা মিডলম্যানের স্থান নেই বলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি জানান, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সুস্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। জেলা অনুমোদন কমিটির উপস্থিতিতে কম্পিউটারচালিত লটারির মাধ্যমে উপভোক্তা নির্বাচন করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি করা হবে। যন্ত্র কেনার পর জিও ট্যাগিং সম্পন্ন হলে সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডিবিটি (DBT)-র মাধ্যমে ভর্তুকির টাকা পৌঁছে যাবে।