রাশিয়াগামী কার্গো হ্যান্ডলিং হঠাৎ স্থগিত! আদানি এয়ারপোর্টসের এই সিদ্ধান্তে তোলপাড় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে

আদানি এয়ারপোর্টস মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাশিয়াগামী নির্দিষ্ট কিছু কার্গোর হ্যান্ডলিং সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুন মেনে চলার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে বিমানবন্দরে ইতোমধ্যে এসে পৌঁছানো কার্গো নিয়ে রুশ বিমান সংস্থাগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি তীব্র আইনি ও প্রশাসনিক বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে। ভারতে রাশিয়ার প্রধান বিমান সংস্থা অ্যারোফ্লট এবং ভোলগা-ডনেপ্র-এর প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘ডেলমোস এভিয়েশন’ এই পুরো প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিয়ম ও ডেলমোস এভিয়েশনের ক্ষোভ
ডেলমোস এভিয়েশনের প্রধান ডঃ নবীন রাও মুম্বাই বিমানবন্দর প্রশাসনকে একাধিক চিঠি ও ইমেল পাঠিয়েছেন। ডঃ রাওয়ের মতে, বিমানবন্দর কর্মকর্তারা তাঁকে জানিয়েছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওফ্যাক)-এর পক্ষ থেকে রাশিয়ার উপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তার জেরে বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে এই কড়াকড়ি করা হচ্ছে।
এই বিবাদ শুধু মুম্বাইয়ের বর্তমান বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নেই। ডেলমোস এভিয়েশন জানিয়েছে যে, ভোলগা-ডনেপ্র এয়ারলাইন্স নভি মুম্বাই বিমানবন্দরে একটি চার্টার ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই চার্টার ফ্লাইটের জন্য প্রাথমিকভাবে একটি স্লট নিশ্চিত করা হলেও, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ পরে তা আকস্মিকভাব বাতিল করে দেয়। স্লটটি হঠাৎ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় এয়ারলাইনটির পুরো সময়সূচী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্ল্যাকরকের বিপুল বিনিয়োগ এবং আদানির সাবধানী পদক্ষেপ
আদানি গ্রুপ বর্তমানে দেশে আটটি প্রধান বিমানবন্দর পরিচালনা করে, যার মধ্যে মুম্বাই এবং আহমেদাবাদের মতো প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও আদানি এয়ারপোর্টস এই বিষয়ে করা মিডিয়ার প্রশ্নের আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো জবাব দেয়নি, তবে ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ওয়াকিবহাল মহল জানাচ্ছে অন্য কথা।
কোম্পানিটি সম্প্রতি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। এই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ব্ল্যাকরক’-এর মতো প্রধান বৈশ্বিক সংস্থা দ্বারা পরিচালিত আমেরিকান ফান্ডও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকান বিনিয়োগকারী যুক্ত হওয়ার পর কোম্পানিটি কোনো মার্কিন বিধি বা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা এড়াতে চাইছে। মূলত সেই কারণেই রাশিয়া-সম্পর্কিত কার্গো হ্যান্ডলিং হঠাৎ বন্ধ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আটকে থাকা পণ্য এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক ক্ষতি
এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বিমানবন্দরে মালামাল চলাচল প্রায় সম্পূর্ণভাবে থমকে গেছে। ডেলমোস এভিয়েশনের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২.৫ টন মালামাল প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বিমানবন্দরের গুদামে পড়ে আছে। সংস্থাটি গুদামে অতিরিক্ত ১২.৫ টন মালামাল আনার অনুমতি চাইছে, যাতে একটি সম্পূর্ণ ১৫-টনের ট্রাক বোঝাই করে দ্রুত পাঠানো সম্ভব হয়।
ডঃ নবীন রাও ব্যাখ্যা করেছেন যে চালানটি এক সপ্তাহ ধরে সেখানে আটকে থাকায় ক্রমাগত বিলম্ব ফি বা ডিটেনশন চার্জ জমা হচ্ছে, যা কোম্পানির উপর একটি অপ্রয়োজনীয় ও বড় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এই বিবাদের মূল আইনি প্রশ্নটি হলো—চালানটি যদি একটি ভারতীয় লজিস্টিক কোম্পানি দ্বারা পরিবহন করা হয় এবং প্রাপক কোনো নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না-ও থাকেন, তাহলেও কি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সরাসরি প্রযোজ্য হতে পারে?
মন্ত্রকের কাছে আবেদন ও বৈষম্যের অভিযোগ
স্থানীয়ভাবে এই সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হয়ে ডেলমোস এভিয়েশন এখন সরাসরি বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যখন ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার সঙ্গে তার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক দৃঢ়ভাবে বজায় রাখছে। গত মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনেও দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
ডেলমোস এভিয়েশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডঃ নবীন রাও এই নিয়মগুলির ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, মুম্বাই থেকে রাশিয়া-সম্পর্কিত পণ্য পরিবহনকারী অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা, যেমন এমিরেটস, তুর্কি এয়ারলাইন্স এবং ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের ক্ষেত্রে ঠিক কী নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে? এই বিদেশি বিমান সংস্থাগুলিকে রাশিয়ার পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হলে তাদের জন্য কী মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এই নিয়মগুলি সমস্ত পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও জোরালো প্রশ্ন তুলেছে সংস্থটি।