ব্যাঙ্কের কোটি কোটি টাকা তছরুপ করে একেবারে শ্রীঘরে! কোন মেগা কেলেঙ্কারিতে ফাঁসল হানজার গ্রুপ?

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির চোখকে ফাঁকি দিয়ে বড়সড় ঋণ জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। হানজার বায়োটেক এনার্জিস (Hanzar Biotech Energies) এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফরেনসিক অডিটের চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণের শত কোটি টাকা ঘুরপথে বিভিন্ন বেনামি ও সহযোগী সংস্থায় পাচার করা হয়েছিল। যার জেরে শেষ পর্যন্ত আসরে নেমে সিবিআই (CBI)-এর দ্বারস্থ হয়েছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ।
ঋণ মঞ্জুরি থেকে খেলাপি ঘোষণা (NPA)
গোটা ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৯ সালে, যখন হানজার গ্রুপ তাদের আর্থিক অবস্থা ও বিভিন্ন প্রকল্পের বিবরণ দিয়ে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার একটি মেয়াদী ঋণ (Term Loan) সুবিধার জন্য আবেদন করে। সেই বছরের ৯ নভেম্বর, ব্যাঙ্কের শাখা ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কোম্পানিটিকে অতিরিক্ত ৭৫ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করা হয়। এরপর ২০১০ সালে তৎকালীন ওরিয়েন্টাল ব্যাংক অফ কমার্স (বর্তমানে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক বা PNB) আরও ৫০ কোটি টাকার মেয়াদী ঋণ অনুমোদন করে। ১৩টি প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত ৩৫০ কোটি টাকার ওই ঋণ সম্পূর্ণ বিতরণও করা হয়েছিল।
কিন্তু বিপত্তি বাধে ২০১১ সালের মে মাস থেকে। অভিযোগ ওঠে, হানজার গ্রুপের অ্যাকাউন্টগুলিতে আচমকাই আর্থিক অনিয়ম শুরু হয়। বারবার ফোন, এসএমএস ও মিটিং করা সত্ত্বেও কোম্পানি কর্তৃপক্ষ অ্যাকাউন্টগুলি নিয়মিত করেনি। এর জেরে ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই হানজার বায়োটেক এনার্জিস-এর হিসাবটিকে নন-পারফর্মিং অ্যাসেট বা খেলাপি (NPA) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ে ব্যাঙ্কের কাছে কোম্পানিটির মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৩.৪৪ কোটি টাকা।
ফরেনসিক অডিটে ২৬২ কোটি টাকার তছরুপের হদিশ
এই বিশাল পরিমাণ ঋণ খেলাপির নেপথ্যে বড় কোনো দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ অ্যাকাউন্টটির একটি ফরেনসিক অডিট করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘বিডিও (ইন্ডিয়া) এলএলপি’-কে। ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি জমা পড়া সেই অডিট রিপোর্টে চোখ কপালে ওঠার মতো তথ্য সামনে আসে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘নাভি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে হানজার বায়োটেক এনার্জিসের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। উভয়েরই অভিন্ন প্রোমোটার, পরিচালক, অংশীদার এবং একই ইমেল ডোমেইন ব্যবহার করার মতো চাঞ্চল্যকর প্রমাণ মিলেছে।
অডিট অনুসারে, প্ল্যান্ট ও যন্ত্রপাতির জন্য বরাদ্দ তহবিলের প্রায় ৯৪.১৩ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ২৬২.৫০ কোটি টাকা—মাত্র পাঁচটি প্রধান সরবরাহকারী সংস্থাকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এই সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে নাভি ইনফ্রা, মুন্সি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, নাভি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, এনভাইরো ইনফ্রাটেক কোম্পানি এবং ইয়েস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।
ফার্নিচারওয়ালা গ্রুপের সঙ্গে যোগ ও তহবিলের অপব্যবহার
তদন্তে আরও জানা যায়, এই সরবরাহকারী সংস্থাগুলির মাধ্যমে প্রাপ্ত তহবিল ফার্নিচারওয়ালা গ্রুপের বিভিন্ন সংস্থাতেও সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০-১১ অর্থবর্ষে নাভি ইনফ্রা ‘হুমা সিনথেটিকস প্রাইভেট লিমিটেড’-কে ২১.৮৮ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদী ঋণ দেয়, যা ইরফান ফার্নিচারওয়ালার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
এদিকে, ঋণ পরিশোধের জন্য নাদিম ফার্নিচারওয়ালা, নুঝাত ফার্নিচারওয়ালা এবং নাজিম আশরাফ ফার্নিচারওয়ালা জামিনদার হিসেবে নিজেদের কিছু সম্পত্তি বন্ধক রাখলেও, ৭৫ কোটি ও ৫০ কোটি টাকার প্রধান দুটি টার্ম লোনের বিপরীতে পর্যাপ্ত কোনো জামানত রাখা হয়নি বলে অভিযোগ। হানজার গ্রুপের অন্যান্য সহযোগী সংস্থা—যেমন হানজার বায়োটেক ভাদোদারা, ভাসাই ও সুরাট প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধেও সিবিআইয়ের কাছে পৃথক জালিয়াতির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
সিবিআইয়ের এফআইআর ও তদন্ত
২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কনসোর্টিয়াম ব্যাংকগুলির কাছে হানজার বায়োটেক এনার্জিসের মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮৪.০৫ কোটি টাকা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও সারফেইসি (SARFAESI) অ্যাক্টের আওতায় পদক্ষেপ নেওয়ার পর, গত ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর এই অ্যাকাউন্টটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জালিয়াতিপূর্ণ’ (Fraud) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ব্যাঙ্কের দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে সিবিআই ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা) ও ১২০-বি (অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র) ধারা এবং দুর্নীতিনিবারণ আইনের একাধিক ধারায় মামলা নথিভুক্ত করেছে। অভিযুক্তদের এই বেআইনি কারসাজির ফলে ব্যাঙ্কের প্রায় ৯৩.৪৪ কোটি টাকার সরাসরি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সিবিআই ইন্সপেক্টর ধরমবীর রানাকে। নামধারী অভিযুক্তদের পাশাপাশি এই কেলেঙ্কারিতে অন্য কোনো অজ্ঞাতপরিচয় সরকারি আধিকারিক বা ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।