ওষুধের পাওয়ার কমাতে ট্যাবলেট ভেঙে অর্ধেক খাচ্ছেন? অজান্তেই কোন মারাত্মক ডেকে আনছেন জানেন?

শারীরিক অস্বস্তি একটু কমলেই কিংবা প্রেসার-সুগারের মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতেই অনেকেই নিজের মনমতো ওষুধের মাত্রা বা ডোজ কমিয়ে দেন। এমনকি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অনেকে আস্ত একটি ট্যাবলেট মাঝখান থেকে ভেঙে অর্ধেক করে খেয়ে নেন। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাটি শিকড় গেড়ে বসে আছে যে, ৫০০ মিলিগ্রামের একটি ট্যাবলেট ভেঙে অর্ধেক খেলেই হয়তো তার পাওয়ার কমে ২৫০ মিলিগ্রাম হয়ে যায় এবং এতে শরীরে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড এফেক্ট কম হয়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান কি আদতে এই ধারণাকে সমর্থন করে? ওষুধ অর্ধেক করে খেলে কি সত্যিই তার কার্যকারিতা বা পাওয়ার কমে যায়?

বিশেষজ্ঞদের মত ও ওষুধের গঠন
ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্ত ওষুধ কেটে বা ভেঙে খাওয়া মোটেও নিরাপদ নয়। ওষুধ তৈরির নেপথ্যে একটি অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক ও ফার্মাসিউটিক্যাল প্রযুক্তি কাজ করে। চিকিৎসকদের মতে, ওষুধের পাওয়ার কমবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ট্যাবলেটটির গঠন এবং সেটি কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে তার ওপর। অনেক ক্ষেত্রে ট্যাবলেট অর্ধেক করলে ওষুধের মাত্রা হয়তো তাত্ত্বিকভাবে অর্ধেক হয়, কিন্তু রক্তে তার শোষণের প্রক্রিয়া বা অ্যাবজরবশন সম্পূর্ণ ব্যাহত হতে পারে। আর এটিই শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কোন ওষুধ ভেঙে খাওয়া যাবে, আর কোনটি নয়?

স্কোরড ট্যাবলেট (Scored Tablets): যে সমস্ত ট্যাবলেটের ঠিক মাঝখানে একটি স্পষ্ট দাগ বা খাঁজ (Score mark) কাটা থাকে, শুধুমাত্র সেই জাতীয় ট্যাবলেটগুলিই সমান দু’ভাগে ভাঙার জন্য প্রস্তুত করা হয়। এই ধরনের ক্ষেত্রে ওষুধ অর্ধেক করলে পাওয়ার বা মাত্রা সমানভাবে অর্ধেক হয়ে যায় এবং চিকিৎসকের নির্দেশিকা অনুযায়ী তা সেবন করা নিরাপদ।

কোটেড বা সাস্টেনড রিলিজ ট্যাবলেট (Extended/Sustained Release): যে সমস্ত ওষুধের নামের পাশে ER, XR, CR বা SR লেখা থাকে (যেমন সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা বিশেষ কিছু পেইনকিলার), সেগুলি শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে অত্যন্ত ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় ধরে দ্রবীভূত হওয়ার জন্য একটি বিশেষ আস্তরণ বা কোটিং দিয়ে তৈরি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই জাতীয় কোটেড ওষুধ ভাঙলে বা গুঁড়ো করলে তার বাইরের রক্ষাকবচ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সম্পূর্ণ ওষুধের উপাদান একবারে শরীরে প্রবেশ করে ‘ড্রাগ ওভারডোজ’ বা অত্যন্ত মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

ক্যাপসুল (Capsules): ক্যাপসুলের ভেতরের তরল বা পাউডার জাতীয় ওষুধও কখনোই ভেঙে অর্ধেক করা উচিত নয়। ক্যাপসুলের খোলক বা ঢাকনাটি পাকস্থলীর এসিড থেকে ভেতরের ওষুধকে সুরক্ষিত রেখে সঠিক স্থানে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।

চিকিৎসকদের কঠোর সতর্কবার্তা
ভারতীয় চিকিৎসকদের স্পষ্ট পরামর্শ হলো—প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়া কখনোই নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ওষুধ ভাঙবেন না বা ডোজ কমাবেন না। যদি কোনো ওষুধের পাওয়ার কমাতে হয় কিংবা ওষুধ গিলতে কোনো সমস্যা হয়, তবে অবশ্যই তা চিকিৎসককে জানান। বর্তমান বাজারে প্রায় সব ওষুধেরই বিভিন্ন কম পাওয়ারের (যেমন ২৫০ মিলিগ্রাম বা ১০০ মিলিগ্রাম) ট্যাবলেট বা লিকুইড সিরাপ আলাদাভাবেই উপলব্ধ থাকে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজে ডাক্তার সেজে ওষুধ ভাঙার এই অভ্যাস ডেকে আনতে পারে চরম বিপদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *