কাদার তলায় ঘুমিয়ে কাটায় মাসের পর মাস! শিং মাছের এই অবিশ্বাস্য বেঁচে থাকার রহস্য জানলে চোখ কপালে উঠবে!

চৈত্র মাসের তীব্র রোদে পুকুরের জল শুকিয়ে মাটি ফেটে চৌচির। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সেখানে জীবনের কোনো চিহ্নই নেই। কিন্তু সেই ফাটা মাটির ফুসফুসের নিচেই দিব্যি লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত প্রাণ! জল তো দূরঅস্ত, মাসের পর মাস এক ফোঁটা খাবার বা জল ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে অতি পরিচিত শিং মাছ। শুধু তাই নয়, জল শুকিয়ে গেলে ডাঙার ওপর দিয়ে হেঁটে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাড়ি দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতাও রয়েছে এই মাছের। কিন্তু কীভাবে এমন অবিশ্বাস্য অসাধ্য সাধন করে এই জলচর প্রাণী?

গ্রীষ্মনিদ্রা ও বেঁচে থাকার কৌশল
গ্রীষ্মের শুরুতে জলাশয় যখন শুকোতে শুরু করে, তখন প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এক অদ্ভুত কৌশল কাজে লাগায় শিং মাছ। কাদার নিচে প্রায় এক হাত গভীরে গর্ত খুঁড়ে আশ্রয় নেয় তারা। বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় এই স্বভাবকে বলা হয় ‘এস্টিভেশন’ বা গ্রীষ্মনিদ্রা। মাটির গভীরে ঢুকে শরীরের সমস্ত বিপাক ক্রিয়া এবং হৃৎস্পন্দন ধীর করে দেয় এই মাছ। শরীরে আগে থেকে জমে থাকা চর্বিই তখন তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র শক্তি জোগায়।

ডাঙায় হাঁটার ক্ষমতা ও বিশেষ অঙ্গ
মাছ মানেই জলের নিচে ফুলকা দিয়ে শ্বাস নেওয়া, কিন্তু শিং মাছের ক্ষেত্রে বিষয়টি একদম আলাদা। এরা সরাসরি বাতাস থেকেও অক্সিজেন নিতে পারে। এদের মাথার নিচ থেকে লেজ পর্যন্ত একটি লম্বা নলাকার বায়ুথলি বা ‘রেসপিরেটরি স্যাক’ থাকে। ফলে জলাশয়ে অক্সিজেনের অভাব হলেও এদের শ্বাস নিতে কোনো সমস্যা হয় না। শুধু তাই নয়, বুকের পাখনা মাটিতে গেঁথে সাপের মতো শরীর বাঁকিয়ে ডাঙায় দিব্যি হেঁটে বেড়াতে পারে এরা। প্রথম বর্ষার বৃষ্টি নামলেই শুকনো ডোবা ছেড়ে পাশের পুকুরে পাড়ি দেয় এই লড়াকু মাছ।

এছাড়া মাটির নিচে শুকিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে এদের চামড়ায় পুরু আঠালো মিউকাসের আস্তরণ থাকে, যা শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখে। এমনকি এই সময়ে কিডনি জলের অপচয় শূন্যে নামিয়ে আনে এবং বর্জ্য পদার্থ বিষাক্ত অ্যামোনিয়ার বদলে নিরাপদ ইউরিয়া হিসেবে জমা হয়। আত্মরক্ষার জন্য এদের পাখনার গোড়ায় একটি বিষাক্ত কাঁটা থাকে, যা মানুষের শরীরে বিঁধলে মারাত্মক জ্বালা ধরে। গ্রামবাংলার কৃষকরা জমি চাষের সময় বহুবার মাটির নিচ থেকে জ্যান্ত শিং মাছ বেরিয়ে আসার সাক্ষী থেকেছেন। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে শিং মাছের এই অবিশ্বাস্য টিকে থাকার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদেরও রীতিমতো অবাক করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *