শীতের আগেই গ্যাসচেম্বারে পরিণত হচ্ছে দিল্লি! বাতাস বিষাক্ত হওয়ার আগেই এবার মেগা অ্যাকশনে নামছে প্রশাসন

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে অক্টোবর মাস আসতেই ফের একবার অবধারিত উদ্বেগের চাদরে ঢাকতে শুরু করেছে দিল্লি-এনসিআর-এর আকাশ। তবে গত বছরগুলির মতো এবার আর দূষণ চরমে পৌঁছানোর জন্য হাত গুটিয়ে বসে থাকছে না প্রশাসন। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই কোণঠাসা করতে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধুলো, যানবাহনের ধোঁয়া, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া কিংবা ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো—দূষণের প্রতিটি সম্ভাব্য উৎসকে একযোগে নির্মূল করতে এবার কোণঠাসা করার পরিকল্পনা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
কেন এই আগাম তৎপরতা?
শীতকাল আসার আগেই পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সজাগ করে তোলার মূল কারণ হলো বায়ু দূষণের সমস্যাটি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মরসুমি সংকট নয়, বরং এক স্থায়ী ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। শীতের দিনে আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কুয়াশা ও ধোঁয়াশা বা স্মগ মাটির কাছাকাছি এসে জমা হয়, যার ফলে মারাত্মক আকার ধারণ করে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই (AQI)। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের মধ্যে সম্প্রতি একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। যেখানে ঠিক হয়েছে যে উত্তরপ্রদেশের এনসিআরভুক্ত আটটি জেলায় এবার চালানো হবে বিশেষ ও গভীর পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
যান্ত্রিক ঝাঁড়ু ও উন্নত পর্যবেক্ষণ:
রাস্তার ধুলো যাতে যানবাহনের চাকার আকর্ষণে বাতাসে উড়ে পিএম ১০ (PM 10) ও পিএম ২.৫ (PM 2.5)-এর মতো ক্ষতিকারক কণা তৈরি করতে না পারে, তার জন্য সনাতনী ঝাড়ুর পরিবর্তে নামানো হচ্ছে আধুনিক যান্ত্রিক মেশিন। শুধু তাই নয়, দিল্লির সরু ও ঘিঞ্জি রাস্তাগুলো পরিষ্কার করার জন্য ৩০টি নতুন বৈদ্যুতিক মেকানিক্যাল সুইপিং মেশিন নামানোর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি, শুধু এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স মেপেই ক্ষান্ত থাকছে না প্রশাসন, বরং দূষণের আসল উৎস—তা সে ধুলো, কারখানা, যানবাহন নাকি আবর্জনা পোড়ানো—তা রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করার জন্য অনলাইন কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম (OCEMS)-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
পরাবাস্তব পরিসংখ্যান বনাম বাস্তব চিত্র:
প্রতি বছর শীতের মুখে খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো নিয়ে সবচেয়ে বেশি জলঘোলা হয়। তবে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বিগত কয়েক বছরে এই প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। রেকর্ড অনুযায়ী, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও দিল্লির এনসিআর অঞ্চলে ২০২১ সালে খড় পোড়ানোর ঘটনা ছিল ৭৮,৫৫০টি। যা ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে ২০২৪ সালে ১২,৭৫০ এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৬,০৮০টিতে নেমে এসেছে। খড় পোড়ানো কমলেও দিল্লির বাতাসের মান যে খুব একটা সন্তোষজনক জায়গায় গিয়েছে, এমনটা নয়। তাই এবার শুধু কৃষকদের দোষ না দিয়ে দূষণের বাকি উৎসগুলোর ওপর সমানভাবে কড়া নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জিআরএপি (GRAP)-র নতুন রূপরেখা:
বায়ুর মান মারাত্মকভাবে খারাপ হওয়ার পর তড়িঘড়ি নির্দেশিকা জারি করার পুরনো পদ্ধতি বদল এনেছে কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (CAQM)। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, আবহাওয়া এবং বাতাসের গতিপ্রকৃতির পূর্বাভাস মিললেই আগেভাগে জিআরএপি (GRAP) বা গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান সক্রিয় করা হবে। যার জেরে প্রয়োজন অনুযায়ী পার্কিং ফি বৃদ্ধি, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, হাইব্রিড ক্লাস চালু, নির্মাণকাজে সাময়িক স্থগিতাদেশ এবং গাড়ির চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের মতো কড়া পদক্ষেপগুলি অনেক আগেই নেওয়া হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তায় যন্ত্র নামিয়ে ধুলো সাফ করা বা বড় বড় আইন প্রণয়ন করা তখনই সফল হবে, যখন সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলি দূষণ প্রতিরোধের প্রাথমিক পাঠ মেনে চলবে। কারণ দিল্লি-এনসিআর-এর আকাশ একদিনে বিষাক্ত হয় না, এর নেপথ্যে থাকে দীর্ঘ কয়েক মাসের অবহেলা। তাই শহরকে বাঁচাতে এবার ‘প্রতিকার’-এর বদলে ‘প্রতিরোধ’-কেই হাতিয়ার করতে চাইছে প্রশাসন।