ভারতে তৈরি হচ্ছে নিজস্ব ‘কৃত্রিম সূর্য’! সফল হলেই চিরতরে মিটবে LPG সংকট

পৃথিবীতেই আমাদের নিজস্ব, এক ছোটখাটো সূর্য! শুনতে অবাক লাগলেও ঠিক এই লক্ষ্যেই এবার বড় সাফল্যের দিকে এগোচ্ছে ভারত। বেঙ্গালুরুর একটি তরুণ স্টার্টআপ এমন এক বিশেষ টোকামাক মেশিন তৈরি করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজ্ঞা’ (PRAGYA)। সম্প্রতি এই পরীক্ষামূলক যন্ত্রটিতে সফলভাবে প্রথমবার প্লাজমা তৈরি হয়েছে। যদিও এই মেশিনটি থেকে এখনই সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে না, তবে নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তির গবেষণায় একে এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বেঙ্গালুরুর এই স্টার্টআপটির নাম ‘প্রানোস ফিউশন’ (Pranos Fusion)। ২০২৪ সালে তৈরি হওয়া এই সংস্থাটির মূল লক্ষ্য হলো, নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে ভবিষ্যতে তা থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। বিজ্ঞানীদের মতে, ‘কৃত্রিম সূর্য’ কথাটির অর্থ এই নয় যে মহাকাশের সূর্যের মতো কোনো গোলক তৈরি হচ্ছে। মূলত সূর্যের অভ্যন্তরে শক্তি তৈরির যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, তাকেই পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন গবেষকরা। সূর্যের কেন্দ্রে অত্যন্ত বেশি তাপ ও চাপের মধ্যে হাইড্রোজেনের মতো হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপুল শক্তি উৎপন্ন করে। ফিউশন প্রযুক্তি সফল হলে পৃথিবীর বুকে অফুরন্ত শক্তির ভাণ্ডার খুলে যেতে পারে।

এই গবেষণার অংশ হিসেবেই তৈরি হয়েছে ‘প্রজ্ঞা’। এটি আসলে একটি কমপ্যাক্ট টোকামাক যন্ত্র, যার ভেতরে অত্যন্ত গরম প্লাজমাকে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে আটকে ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পদার্থের অত্যন্ত উত্তপ্ত এই অবস্থাকে সাধারণ কোনো পাত্রে রাখা সম্ভব নয়, কারণ এর তীব্র তাপে পাত্র গলে যেতে পারে। তাই চৌম্বক ক্ষেত্রের মারপ্যাঁচেই চলে এই বন্দিদশা। সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘প্রজ্ঞা’ ছাড়াও তাদের গবেষণার অন্যতম হাতিয়ার হলো ‘জেন্গা’ (JENGA) নামক একটি বিশেষ সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম, যা টোকামাকের ডিজাইন ও প্লাজমা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পাশাপাশি, ‘মাগগা’ (MAGGA) নামে উচ্চ-তাপমাত্রার সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট নিয়েও কাজ করছে তারা।

ছোট এই মেশিনের সফল পরীক্ষার পর এবার আরও বড় ফিউশন রিঅ্যাক্টর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে ওই স্টার্টআপের। তাদের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপে ‘প্রানীক’ (PRANIQ) নামের একটি বৃহৎ মাপের ফিউশন সিস্টেমের কথা রয়েছে। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক স্তর পার করে এমন একটি প্রযুক্তিতে পৌঁছানোই তাদের লক্ষ্য, যা ভবিষ্যতে অফুরন্ত শক্তির জোগান দিতে পারে।

এদিকে প্রশ্ন উঠছে, এই ফিউশন প্রযুক্তি কি ভবিষ্যতে রান্নার গ্যাসের দাম বা সংকট কমাতে পারবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিউশন প্রযুক্তি সফল হলে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। সেই বিদ্যুৎ শিল্প, পরিবহন থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা কাজে ব্যবহার করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমতে পারে। তবে বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা এখনও একটি অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ, তাই এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *