‘শনির চাঁদের কৃত্রিম পরিবেশে’-বরফের নিচে লুকিয়ে কি ভিনগ্রহী জীব?

পৃথিবীর বাইরে কি তবে সত্যিই অস্তিত্ব রয়েছে অন্য কোনো প্রাণের? সৌরজগতের অন্যতম রহস্যময় উপগ্রহ শনির চাঁদ ‘এনসেলাডাস’ (Enceladus)-এর বরফে ঢাকা পৃষ্ঠ থেকে জলের ফোয়ারা বা বাষ্প উদ্গীরণের দৃশ্য দেখার পর থেকেই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই স্থানটি। এবার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় শনির এই উপগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, জাপানের গভীর সমুদ্রের চরম প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকা কিছু অণুজীব এনসেলাডাসের বরফাবৃত ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত মহাসাগরের মতো কঠিন পরিস্থিতিতেও টিকে থাকতে সক্ষম।
কী জানা যাচ্ছে নতুন গবেষণায়? ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাগরতলের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উষ্ণ প্রস্রবণের কাছাকাছি বাস করা কিছু বিশেষ অণুজীব হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডকে মিথেনে রূপান্তর করে বেঁচে থাকে। গবেষণাগারে শনির এই উপগ্রহের মহাসাগরের ঠিক অনুরূপ একটি কৃত্রিম লবণাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিলেন মিউনিখের ‘লুডভিগ-ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি’র ভূ-মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক উইলিয়াম ওরসি এবং তাঁর সহকর্মীরা।
সেই কৃত্রিম পরিবেশে জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যবর্তী ওকিনাওয়া খাদের গভীর সমুদ্রের উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে সংগৃহীত অণুজীবের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পিএইচ মাত্রা ১১-এ পৌঁছানোর পরও— যা এসব জীবের পরিচিত সহ্যক্ষমতার সীমার বাইরে— সেই কৃত্রিম সমুদ্রে দিব্যি বেড়ে উঠেছে অণুজীবগুলি। এমনকি জলের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব কম থাকায় তারা নিজেদের বিপাক ক্রিয়াও চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণার ফল বলছে, সুদূর এনসেলাডাসে হয়তো সরাসরি বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নেই, তবে সেখানে অন্তত নির্দিষ্ট কিছু প্রাণের টিকে থাকার মতো অনুকূল পরিস্থিতি রয়েছে। ‘ওপেন ইউনিভার্সিটি’-র প্ল্যানেটারি জিওসায়েন্সের অধ্যাপক ডেভিড রদারির মতে, কৃত্রিম এনসেলাডাস সমুদ্রে এই অণুজীবগুলির টিকে থাকা সম্ভব হওয়ায় ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা দূর হলো।
কীভাবে মিলল এনসেলাডাসের মহাসাগরের সন্ধান? আড়াই শ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৩০০ মাইল চওড়া বরফের গোলকের মতো এনসেলাডাসকে খুব একটা বিশেষ কিছু মনে করেননি বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ২০০০-এর দশক থেকে নাসার ‘ক্যাসিনি’ প্রোব এবং পরবর্তীতে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের কল্যাণে এই ধারণার সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন যে এনসেলাডাসের জমাট বাঁধা পৃষ্ঠের নিচে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল লবণাক্ত মহাসাগর, যার তলদেশ উষ্ণ প্রস্রবণে ভরপুর। গত বছর ক্যাসিনি প্রোব এনসেলাডাসের তেমনই এক বাষ্পীয় ফোয়ারার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় সংগৃহীত নমুনায় জৈব পদার্থের উপস্থিতি খুঁজে পান গবেষকরা।
একই জার্নালে প্রকাশিত অপর এক গবেষণা প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এনসেলাডাসের বাষ্পীয় ফোয়ারার বরফ কণাগুলি কীভাবে জমে ও ভেঙে সমুদ্রের বিভিন্ন উপাদানকে আলাদা করে ফেলে। মহাসাগরের ফোঁটাগুলোতে যদি ভিনগ্রহের কোনো অণুজীবের টুকরো থাকে, তবে তা বরফ কণার ক্ষুদ্র অংশে ঘনীভূত অবস্থায় পাওয়া যেতে পারে। ‘ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ বার্লিন’-এর অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক পোস্টবার্গ একে প্রাণের সন্ধানের জন্য ‘চমৎকার খবর’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযান এনসেলাডাসকে ঘিরে চলা এই রোমাঞ্চকর গবেষণা সেখানে পুনরায় মহাকাশযান পাঠানোর আগ্রহ বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি’ বা ইএসএ-এর প্রস্তাবিত ‘এলফোর’ মিশনে শনি গ্রহকে প্রদক্ষিণকারী একটি অরবিটারের সঙ্গে একটি ল্যান্ডার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ল্যান্ডারটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করে এর মহাসাগর থেকে উদ্গীরিত বাষ্পে প্রাণের জৈব-চিহ্ন বা বায়োসিগনেচার অনুসন্ধান করবে। তবে এর জন্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা করতে হবে, কারণ ২০৪২ সালের দিকে এই মিশন উৎক্ষেপণের প্রস্তাব করা হয়েছে এবং তা ২০৫০-এর দশকের আগে শনি গ্রহে পৌঁছাবে না।