২৭ হাজার টাকার ওষুধের দাম মাত্র ৩ হাজার! লাগামহীন ওষুধমূল্য নিয়ে কেন্দ্রকে সুপ্রিম কোর্টের কড়া প্রশ্ন

ক্যান্সারের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে সাধারণ চিকিৎসার সামগ্রী—বাজার জুড়ে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এবার কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়ল প্রশাসন। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্ট জানতে চেয়েছে, কেন এমন একটি অভিন্ন নীতি তৈরি করা হবে না যেখানে খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রয়মূল্য বা পিটিআর-এর (PTR) তুলনায় সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি (MRP) সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হবে?
বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ ২০১৩ সালের ড্রাগস প্রাইসেস কন্ট্রোল অর্ডার (ডিপিসিও) সংক্রান্ত একাধিক মামলার শুনানিতে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। আদালত মনে করছে, বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছেন।
বিশাল মূল্যের ফারাক নিয়ে আদালতের উদ্বেগ
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি সন্দীপ মেহতা ওষুধের দামের আকাশচুম্বী পার্থক্যের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি ইশারা করেন যে, বাজারে প্রায় ২৭,০০০ টাকা এমআরপি থাকা একটি ক্যান্সারের ওষুধের খুচরা বিক্রেতার কাছে দাম (PTR) মাত্র প্রায় ৩,০০০ টাকা। এই বিরাট ব্যবধানের কথা তুলে ধরে আদালত গত শুনানিতে উত্থাপিত ১০ গুণ বা তারও বেশি মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করে।
শুধু তাই নয়, কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর বাণিজ্যিক নীতির তীব্র সমালোচনা করে বেঞ্চ জানিয়েছে, অনেক হাসপাতালই রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে না দিয়ে জোরপূর্বক তাদের নিজেদের ইন-হাউস ফার্মেসি থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য করে। এর জেরে আয়ুষ্মান ভারত বা অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বাড়তি খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতাদের ঘাড়েই এসে চাপে।
আদালত আরও প্রশ্ন তোলে, কেন সমস্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের আওতায় আনা হবে না? যদি কোনো পণ্য অত্যাবশ্যকীয় হয়, তবে তা কীভাবে ডিপিসিও-র আওতার বাইরে থাকতে পারে?
আইনগত ফাঁকফোকর এবং সরকারের বক্তব্য
আবেদনকারীদের পক্ষের আইনজীবী কিষাণ চাঁদ জৈন ও অন্যরা আদালতে জানান যে, বাজারমূল্যের একটি ছোট অংশ বা ‘তালিকাভুক্ত ওষুধ’-এর ক্ষেত্রে দামের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত থাকলেও, বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ বা তার বেশি অংশ জুড়ে থাকা ‘তালিকাভুক্ত নয় এমন ওষুধ’-এর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো বার্ষিক ১০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে। এর ফলে চিকিৎসার খরচ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়, যা মেটাতে সাধারণ মানুষকে সহায়-সম্পত্তি বা গয়না পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে জানান যে, সমস্ত পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। তবে তাঁর দাবি, এই অতিরিক্ত মুনাফার পুরোটাই ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর পকেটে যাচ্ছে না।
সব পক্ষের বক্তব্য শুনে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১২ অক্টোবর তারিখ ধার্য করেছে। শীর্ষ আদালতের এই কঠোর অবস্থানের পর চিকিৎসা খরচ নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো আইনি পদক্ষেপ আসতে পারে বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞমহল।