হিমাচল রাজনীতিতে বড় ধাক্কা! প্রয়াত পাঁচবারের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী মেজর বিজয় সিং মনকোটিয়া

হিমাচল প্রদেশের রাজনীতিতে নেমে এল বড় ধাক্কা। পাঁচবারের বিধায়ক এবং দু’বারের মন্ত্রী তথা রাজ্যের অন্যতম হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মেজর বিজয় সিং মনকোটিয়া প্রয়াত হয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে কাংড়ায় তাঁর পৈতৃক গ্রাম তিয়ারায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় থাকলেও, মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর জীবনাবসান হয়।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই বিপর্যয়
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে হঠাৎই শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দ্রুত ফোর্টিস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পথেই তাঁর ভয়াবহ হার্ট অ্যাটাক হয় এবং হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ১৯৩৮ সালে জন্ম নেওয়া এই প্রবীণ নেতার প্রয়াণে হিমাচলের রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জীবিতকালে কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় দলেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মেজর মনকোটিয়া। দীর্ঘকাল কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা থাকলেও, পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক চুকিয়ে তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বীরভদ্র সিংয়ের বিরুদ্ধে খোদ রাজনৈতিক ময়দানে তাঁর কঠোর বিরোধিতার বিষয়টি রাজ্য রাজনীতিতে একসময় সবচেয়ে চর্চিত অধ্যায় ছিল। ২০০৭ সালে বীরভদ্র সিংয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের একটি পুরোনো সিডি বোমা ফাটিয়ে তিনি রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন।
সেনা থেকে রাজনীতির আঙিনায় বর্ণময় জীবন
রাজনীতিতে আসার আগে মেজর বিজয় সিং মনকোটিয়ার জীবন ছিল গৌরবোজ্জ্বল সামরিক ও কর্মজীবনে ভরপুর। ১৯৫৯ সালে ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষায় সর্বভারতীয় মেধাতালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে তিনি ইতিহাস গড়েন। ১৯৬০ সালে দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে (IMA) যোগ দিয়ে ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে আইএমএ-র কন্টিনজেন্টের নেতৃত্ব দেওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। গোর্খা রাইফেলসে কমিশনপ্রাপ্ত এই অফিসার ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছিলেন। সামরিক জীবনে অসামান্য দক্ষতার জন্য তাঁকে ‘সোর্ড অফ অনার’ এবং গোল্ড মেডেল দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
১৯৭৬ সালে নির্ধারিত সময়ের আগেই সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর জেআরডি টাটার আমন্ত্রণে তিনি এয়ার ইন্ডিয়ায় পাঁচ বছর সফলভাবে চাকরি করেন। এরপর ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে পা রেখেই শাহপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্দল প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি পাঁচবার বিধায়ক নির্বাচিত হন এবং হিমাচল প্রদেশ সরকারের পর্যটন, অসামরিক বিমান পরিবহণ ও আইন দফতরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব সামলান।
একজন সফল রাজনীতিক ও সেনাকর্তা ছাড়াও তিনি ছিলেন একাধারে লেখক ও চিন্তাবিদ। তাঁর লেখা ‘দ্য প্যাটার্নস অফ ডেস্টিনি’, ‘টার্ময়েল’ এবং ‘আপহিভাল’ বইগুলিতে তাঁর জীবনদর্শন ও সমাজভাবনা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গিয়েছেন তাঁর স্ত্রী জয়শ্রী কুমারী এবং দুই সন্তান—পুত্র সূর্যবীর সিং ও কন্যা সংযুক্তা কুমারীকে। তাঁর প্রয়াণে এক বর্ণময় রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।