শেয়ার বাজারে লিস্ট হওয়ার নিয়ম থেকে বাঁচতে বড় মাস্টারস্ট্রোক! টাটা সন্স নিয়ে সামনে এল বিরাট পরিকল্পনা

টাটা সন্স-এর ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে টাটা ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এক অভিনব ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সামনে আনা হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর পেশ করা এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, টাটা ইলেকট্রনিক্স সিস্টেমস সলিউশনস (TESS) এবং টাটা কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স (TCE)-কে সরাসরি টাটা সন্স প্রাইভেট লিমিটেড (TSPL)-এর সঙ্গে একীভূত বা মার্জ করার কথা বলা হয়েছে। টাটা ট্রাস্টগুলির মতে, এই কৌশলগত পুনর্গঠন সফল হলে টাটা সন্স আর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের Non-Banking Financial Company (NBFC) বা Core Investment Company (CIC)-এর কঠোর নিয়মের বেড়াজালে পড়বে না।
কেন টাটা সন্স-এর কাঠামো বদলের প্রস্তাব?
বর্তমানে টাটা গ্রুপে প্রধান হোল্ডিং বা নিয়ন্ত্রণকারী কোম্পানি হিসেবে কাজ করে টাটা সন্স। তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (RBI) রেগুলেটরি ক্লাসিফিকেশনের নিয়মের কারণে সংস্থাটিকে সিআইসি (CIC) এবং আপার-লেয়ার এনবিএফসি (NBFC)-র সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকতে হচ্ছে। আর এই ক্যাটাগরিতে থাকার অর্থ হলো, নিয়ম অনুযায়ী টাটা সন্সকে বাধ্যতামূলকভাবে শেয়ার বাজারেও নথিভুক্ত (IPO) হতে হবে।
কিন্তু টাটা সন্স-এর প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক এমন কয়েকটি ট্রাস্ট, যারা শুরু থেকেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা এই সংস্থাকে শেয়ার বাজারে লিস্ট করাতে ইচ্ছুক নয়। ফলস্বরূপ, রেগুলেটরির চাপ এড়াতে এবং সংস্থাকে শেয়ার বাজারে যাওয়া থেকে বাঁচাতে এই নতুন পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবিত কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো, টাটা সন্সকে কেবল একটি নিয়ন্ত্রণকারী বা হোল্ডিং কোম্পানি হিসেবে না রেখে তার মধ্যে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা ও বিপুল উপার্জন করার পুরনো পরিকাঠামো ফিরিয়ে আনা।
টিইএসএস (TESS) এবং টিসিই (TCE) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই প্রস্তাবিত মার্জারের ক্ষেত্রে এই দুটি সংস্থাকে বড় হাতিয়ার করা হচ্ছে:
TESS: এই সংস্থাটি মূলত টাটা গ্রুপের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এর কাজের পরিধিতে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্যাকেজিং, অ্যাডভান্সড ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন এবং নিখুঁত যন্ত্রাংশ তৈরির মতো অত্যন্ত লাভজনক ক্ষেত্র।
TCE: অন্যদিকে টাটা কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স হলো একটি স্বনামধন্য ইঞ্জিনিয়ারিং কনসাল্টেন্সি ফার্ম। শক্তি, পরিকাঠামো, বৃহৎ পুঁজি এবং মেগা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের মতো বিভিন্ন জটিল ক্ষেত্রে উন্নত পরিষেবা দিয়ে থাকে এই সংস্থা।
এই দুই সংস্থাকে যদি সরাসরি টাটা সন্স-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তবে মূল হোল্ডিং কোম্পানির নিজস্ব ব্যবসা থেকে আয় নাটকীয়ভাবে বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে।
পুরনো শতবর্ষের ঐতিহ্যেই কি ফিরছে টাটা?
টাটা ট্রাস্টগুলির বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবিত পরিকাঠামো মূলত একশো বছর আগে যেভাবে টাটা সন্স পরিচালিত হতো, তারই আধুনিক রূপ। কারণ, একটা দীর্ঘ সময় ধরে টাটা সন্স-এর নিজস্ব ব্যবসা এবং সেখান থেকে উপার্জনের ইতিহাস রয়েছে। এমনকি বিখ্যাত তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট টিসিএস (TCS)-ও একসময় টাটা সন্স-এরই একটি নিজস্ব ব্যবসায়িক বিভাগ ছিল। পরবর্তীকালে ২০০৪ সালে তা আলাদা সাবসিডারি হিসেবে ডিমার্জ হয়। ফলে সেই পুরনো কার্যপদ্ধতির দিকেই ফের পা বাড়াতে চাইছে টাটা ট্রাস্ট।
হিসাব বলছে, চলতি বছরের ৩১ মার্চের তথ্যানুযায়ী, এই প্রস্তাবিত মার্জড সংস্থার মূল ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় প্রায় ১ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পদ থেকে এই সংস্থার উপার্জন দাঁড়াবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায়। এই অনুপাতের মারপ্যাঁচেই মূলত আরবিআই-এর এনবিএফসি সংক্রান্ত ‘প্রিন্সিপাল বিজনেস’ মানদণ্ড এবং সিআইসি-র ৯০ শতাংশ বিনিয়োগের সীমারেখা সফলভাবে এড়ানো সম্ভব হবে।
এবার পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
পুরো বিষয়টি এখনও একটি প্রস্তাবের স্তরেই রয়েছে। টাটা ট্রাস্টগুলি টাটা সন্স-এর বোর্ডকে এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এই মার্জার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হলে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক বা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের (RBI) অফিশিয়াল ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা এনওসি (NOC) নেওয়া বাধ্যতামূলক। আরবিআই-এর চূড়ান্ত অনুমোদন এবং অন্যান্য কর্পোরেট প্রক্রিয়া মিটলেই কেবল এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে। বলাই বাহুল্য, টাটা সন্সের আগামী দিনের রূপরেখা এখন সম্পূর্ণভাবে এই প্রস্তাবের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে রয়েছে।