ভগত সিংকে সবাই দেশের হিরো মানে, তবে নিজের ঘরে দেখতে ভয় পান কেন অভিভাবকরা? ভাবাবেগকে নাড়া দেবে এই সত্য!

ভগত সিং—এই একটিমাত্র নাম শুনলেই আমাদের বুক গর্বে ফুলে ওঠে। আমরা তাঁর সাহসিকতা, দেশের জন্য হাসিমুখে ফাঁসি কাঠে ঝুলে পড়ার ইতিহাস নিয়ে বড় বড় কথা বলি। ঘরে তাঁর ছবি টাঙাই, তাঁকে নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে ভেবে দেখেছেন কি, আমরা আদতে কেমন ভগত সিংকে পছন্দ করি?

পোস্টারের ভগত সিং বনাম বাস্তবের প্রশ্ন

আমাদের সমাজ এমন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতিতে বিশ্বাস করে, যেখানে আমরা ভগত সিংকে শুধু ইতিহাসের পাতায় বা ঘরের দেয়ালে টাঙানো ছবির ফ্রেমেই দেখতে ভালোবাসি। প্রতিবেশীর সন্তান যখন কোনো অন্যায় বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে, তখন আমরা তাকে সাহসী বলি, তার পিঠ চাপড়ে দিই। কিন্তু সেই একই প্রশ্ন যদি আমাদের নিজেদের সন্তান ঘরের টেবিলে বসে করে—যদি সে বলে, “কেন আমি চোখ বুজে সব মেনে নেব? কেন প্রশ্ন করব না?”—তখনই আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

তখনই আমরা ভগত সিংয়ের আসল আদর্শকে ভয় পেতে শুরু করি। আমরা সন্তানকে থামিয়ে দিই, বলি বেশি কথা না বলতে বা বড়দের কথা চুপচাপ মেনে নিতে।

ভগত সিংয়ের আসল অবদান কী ছিল?

শহিদ ভগৎ সিংয়ের সবচেয়ে বড় অবদান শুধু এই নয় যে তিনি মৃত্যুকে ভয় পাননি। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ছিল তাঁর স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তা। তিনি অন্ধভাবে কোনো কিছু সত্য বলে মেনে নেননি। তিনি পড়াশোনা করেছেন, বিতর্ক করেছেন, প্রতি পদে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতেন, একটি স্বাধীন দেশের জন্য কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়, মানুষের মন ও চিন্তার স্বাধীনতাও সমানভাবে জরুরি।

কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা সেই সাহসিকতাকে শুধু উদযাপনের বস্তু বানিয়ে ফেলেছি। শহীদদের আমরা সম্মান করি, কারণ ইতিহাস তাঁদের সঠিক বলে রায় দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কোনো তরুণ বা কিশোর যখন সমাজে প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে, তখন আমরা তাকে বিদ্রোহী বা অবাধ্য তকমা দিয়ে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।

আসল সাহসিকতা কোথায়?

সাহস কেবল মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাহস অনেক সময় অত্যন্ত শান্ত হয়। যখন সমাজের সবাই স্রোতের বিপরীতে কথা বলছে, তখন নিজের যুক্তিতে অটল থাকা—নতুন কিছু শিখে নিজের ভুল স্বীকার করা এবং অন্ধ বিশ্বাসের সামনে দাঁড়িয়ে জোরালোভাবে ‘কেন?’ এই প্রশ্নটি করা হলো সবচেয়ে বড় সাহস।

কোনো দেশ কেবল তার অতীত বীরদের জন্য স্বাধীন থাকে না; দেশ প্রকৃত অর্থে তখনই স্বাধীন হয়, যখন সাধারণ পরিবারগুলি তাদের নিজেদের সন্তানদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার এবং প্রশ্ন করার অধিকার দেয়। তাই শুধু পোস্টারে বা স্মরণে নয়, ভগত সিংয়ের সেই প্রশ্ন করার মানসিকতাটিকে নিজেদের ঘরের ডাইনিং টেবিলে জায়গা দেওয়ার সময় এসেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *