গাড়ির সুরক্ষায় বিরাট কড়াকড়ি! ভারতের নতুন নীতিতে বদলে যাচ্ছে গাড়ি কেনার নিয়ম, ফাঁস হলো বড় আপডেট

ভারতে গাড়ির সুরক্ষার মানদণ্ড আরও কঠোর করতে প্রস্তুতি শুরু করে দিল কেন্দ্র। দেশের রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে যাত্রীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবার আরও ব্যাপক পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে সরকার। এই লক্ষ্যেই অত্যন্ত কড়া নিয়ম নিয়ে আসতে চলেছে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রক। ২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে দেশে চালু হতে পারে নতুন ও উন্নত সংস্করণ—‘ভারত এনসিএপি ২.০’ (Bharat NCAP 2.0)।

বর্তমান ব্যবস্থায় মূলত কোনো দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার পর গাড়ির ভেতরের যাত্রীরা কতটা সুরক্ষা পাচ্ছেন, তা মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু নতুন নিয়মে সুরক্ষার পরিধি শুধু এইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং দুর্ঘটনার আগের পরিস্থিতি, দুর্ঘটনার মুহূর্ত এবং দুর্ঘটনার ঠিক পরের অবস্থা—এই তিনটি আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে গাড়ির সামগ্রিক নিরাপত্তা খতিয়ে দেখা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভারতীয় বাজারে বিক্রি হওয়া গাড়িগুলোর মান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা স্তরের সমকক্ষ করে তোলা।

পাঁচটি কঠিন সংঘর্ষ পরীক্ষায় পাস করতে হবে গাড়িগুলিকে:
নতুন নীতি চালু হলে গাড়ি নির্মাতাদের আরও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় যেখানে তিনটি প্রধান ক্র্যাশ টেস্ট করা হয়, সেখানে প্রস্তাবিত ‘ভারত এনসিএপি ২.০’ অনুযায়ী গাড়িগুলোকে মোট পাঁচটি ভিন্ন ক্র্যাশ টেস্টে উত্তীর্ণ হতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

ঘণ্টায় ৬৪ কিমি গতিতে অফসেট ফ্রন্টাল ইমপ্যাক্ট টেস্ট।

ঘণ্টায় ৫০ কিমি গতিতে ফুল-উইডথ রিজিড ব্যারিয়ার টেস্ট।

ঘণ্টায় ৫০ কিমি গতিতে ল্যাটারাল ইমপ্যাক্ট টেস্ট।

ঘণ্টায় ৩২ কিমি গতিতে পোল সাইড ইমপ্যাক্ট টেস্ট।

ঘণ্টায় ৫০ কিমি গতিতে রিয়ার ইমপ্যাক্ট টেস্ট।
এই কঠোর পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট গাড়ির বডি স্ট্রাকচার এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশের অন্তর্নিহিত শক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

দুর্ঘটনা ঘটানোর আগেই প্রতিরোধের ওপর জোর:
নতুন এই ব্যবস্থায় কেবল সংঘর্ষের সময় যাত্রীদের সুরক্ষাই মাপা হবে না, বরং গাড়িটি নিজে থেকে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কতটা কার্যকর, তাও খতিয়ে দেখা হবে। এর জন্য গাড়িতে থাকা অ্যাডভান্সড ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম (ADAS), স্বয়ংক্রিয় জরুরি ব্রেকিং, লেন থেকে বিচ্যুতির সতর্কতা (Lane Departure Warning) এবং ব্লাইন্ড স্পট মনিটরিংয়ের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগুলির কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য বিপদ আগে থেকেই সেন্সর বা ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করে চালককে সতর্ক করতে গাড়িটি কতটা সক্ষম, তা এবার স্টার রেটিংয়ের মাপকাঠি হবে।

পথচারী ও দুই চাকার চালকদের সুরক্ষাও সমান গুরুত্ব পাবে:
সড়ক দুর্ঘটনায় কেবল গাড়ির ভেতরের যাত্রীরাই নন, বরং পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং বাইকচালকদেরও মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই দিকটি মাথায় রেখে নতুন কাঠামোর একটি প্রধান অঙ্গ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে ‘ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী সুরক্ষা’ (Vulnerable Road User Protection)। এর মাধ্যমে গাড়ির সামনের অংশের নকশা পরীক্ষা করা হবে। দুর্ঘটনার সময় পথচারীর আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমাতে গাড়ির বনেট, বাম্পার এবং উইন্ডশিল্ডের চারপাশের অংশ কতটা সুরক্ষাদায়ক, তা খতিয়ে দেখা হবে।

দুর্ঘটনার পরের উদ্ধারকাজও হবে প্রযুক্তিনির্ভর:
বড় দুর্ঘটনার পরের প্রথম কয়েক মিনিট জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘ভারত এনসিএপি ২.০’-এ দুর্ঘটনার ঠিক পরের মুহূর্তে গাড়ির আচরণ কেমন হবে, তা পরীক্ষামূলকভাবে দেখা হবে। দুর্ঘটনার পরপরই গাড়ির দরজাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আনলক হয়ে খুলে যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি, সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার মেকানিজম এবং জরুরি পরিষেবাগুলিতে (Emergency Services) স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির সঠিক অবস্থান বা লোকেশন পাঠিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি রয়েছে কি না, তাও এই পরীক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০২৭ সালের অক্টোবরের মধ্যে এই প্রস্তাবিত নিয়মগুলি পুরোপুরি কার্যকর হলে অটোমোবাইল সংস্থাগুলোকে গাড়ির সুরক্ষার প্রতি আরও অনেক বেশি নজর দিতে হবে। পাশাপাশি, গাড়ি ক্রেতারাও কেবল গতানুগতিক স্টার রেটিং দেখে নয়, বরং বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে একটি গাড়ি ঠিক কতটা নিরাপদ, তা জেনেই গাড়ি কেনার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *