যুদ্ধের বাজারেও ভারতকে বাঁচিয়েছিল রাশিয়ার তেল! মস্কোর সাফ দাবিতে শোরগোল বিশ্ব রাজনীতিতে

মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, ঠিক সেই সংকটজনক পরিস্থিতিতে ভারতকে আক্ষরিক অর্থেই বাঁচিয়েছিল মস্কো। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকার সময় ভারতের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে রাশিয়া যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তাতেই প্রমাণিত হয় যে মস্কোই নয়াদিল্লির প্রকৃত ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার। সম্প্রতি রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই দাবিই জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুদেঙ্কো।
রুদেঙ্কো স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, কঠিন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের বন্ধু দেশের সমস্ত চাহিদা পূরণ করতে বদ্ধপরিকর রাশিয়া। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে গড়ে ওঠা দ্বিপাক্ষিক জ্বালানি বাণিজ্যের সুব্যবস্থাই বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের যেকোনো বিঘ্নকে সফলভাবে প্রশমিত করতে সাহায্য করেছে বলে দাবি তাঁর। শুধু তেল সরবরাহ হওয়াই নয়, এর পাশাপাশি রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথাও স্মরণ করান তিনি। সেই সঙ্গে খুব শীঘ্রই রুশ নকশায় আরও একটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জায়গাও চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তেল আমদানিতে রেকর্ড ভাঙা পরিসংখ্যান:
মধ্যপ্রাচ্যের ওই উত্তাল সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পর ভারতের শোধনাগারগুলো বিকল্প হিসেবে রাশিয়া থেকেই আমদানির পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধের জেরে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ভারতে জ্বালানি সরবরাহ তীব্রভাবে হ্রাস পেলেও, মার্চ ২০২৬-এ ভারতের রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে দৈনিক প্রায় ২২.৫ লক্ষ ব্যারেলে (BPD) গিয়ে ঠেকে। যা সেই সময় ভারতের মোট তেল আমদানির অর্ধেক ছিল। পণ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘কেপলার’-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে আগস্ট মাসে ভারতে রুশ তেল সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ২১ লক্ষ ব্যারেল এবং সেপ্টেম্বর মাসে তা ছিল প্রায় ১৯ লক্ষ ব্যারেল।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও আমেরিকার চাপ নিয়ে ভারতের অনড় অবস্থান:
রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন আমেরিকা ও ইউক্রেনের তরফ থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া ঝুলছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইনের আওতায় রুশ তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করার পক্ষে সওয়াল করেছেন। পাশাপাশি, রাশিয়ার তেল কেনার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারে এমন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আইন নিয়ে ওয়াশিংটনের কাছে নিজেদের গভীর উদ্বেগের কথাও ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে জানিয়েছে ভারত।
নয়াদিল্লির দ্ব্যর্থহীন বার্তা, প্রায় ১৪০ কোটির বিশাল জনসংখ্যার দেশে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে দেশের একাধিক নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীর প্রয়োজন রয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বিকৃত বা সীমাবদ্ধ করতে পারে এমন যেকোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধেও বরাবরই সতর্কবার্তা দিয়ে এসেছে ভারত সরকার। সংকটময় পরিস্থিতিতে রাশিয়ার এই পাশে দাঁড়ানো এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে ভারতের নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার নীতি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।