ভোটার কার্ডের নথিতে বয়সের চরম গোলমাল! দিল্লির বর্তমান ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে কমিশনের সমন, তোলপাড় রাজধানী

জাতীয় রাজধানীর ভোটার তালিকা স্বচ্ছ ও নির্ভুল করতে গিয়ে নজিরবিহীন তথ্যের মুখোমুখি হয়েছে ভারত নির্বাচন কমিশন। দিল্লিতে চলমান ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার নথিতে বিস্তর গরমিল ধরা পড়ায় ৩৩.১ লক্ষেরও বেশি নাগরিককে কড়া নোটিস পাঠিয়েছে দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দপ্তর। তবে সবথেকে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, কমিশন থেকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাওয়া সেই দীর্ঘ তালিকায় নাম রয়েছে দিল্লির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল এবং দিল্লির প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেবের মতো হেভিওয়েট রাজনীতিকদের।

গত ৩১ আগস্ট নির্বাচন কমিশন দিল্লির প্রাথমিক খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। প্রায় তিন সপ্তাহ পর কমিশন সেইসব নাগরিকদের তালিকা প্রকাশ্যে এনেছে, যাঁদের ভোটার কার্ডের তথ্যে গুরুতর অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ এবং ‘নন-ম্যাপিং’ জাতীয় নানা সমস্যা পাওয়া গিয়েছে।

কেন নোটিস পেলেন মুখ্যমন্ত্রী ও অন্য ভিআইপিরা?

কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, তালিকায় থাকা শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভোটার তথ্যে বেশ কিছু অদ্ভুত ও বায়োলজিক্যাল অসঙ্গতি ধরা পড়েছে:

  • রেখা গুপ্তা (দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী): সরকারি নথি অনুযায়ী, তাঁর এবং তাঁর বাবা-মায়ের নথিভুক্ত বয়সের মধ্যে পার্থক্য ধরা পড়েছে ১৫ বছরেরও কম। কমিশনের ডিজিটাল ফিল্টারে এই লজিক্যাল অসঙ্গতি ধরা পড়ায় তাঁকে শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে।

  • অরবিন্দ কেজরিওয়াল (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী): অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বর্তমান তথ্য আগের এসআইআর (SIR) ডাটাবেসের রেকর্ডের সঙ্গে মেলেনি। একই কারণে কেজরিওয়ালের স্ত্রী সুনীতা কেজরিওয়াল, তাঁদের ছেলে পুলকিত কেজরিওয়াল এবং তাঁর বাবা-মাকেও নোটিসের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

  • কপিল সিব্বল ও বীরেন্দ্র সচদেব: রাজ্যসভার প্রবীণ সাংসদ কপিল সিব্বলের ক্ষেত্রেও পুরনো তথ্যের সঙ্গে অমিল পাওয়া গিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা বীরেন্দ্র সচদেব, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর ভাইয়ের নাম সংক্রান্ত অসঙ্গতির জন্য সমন পাঠানো হয়েছে।

‘নন-ম্যাপিং’ ও ‘লজিক্যাল অসঙ্গতি’র বড় খতিয়ান

নির্বাচন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, চিহ্নিত ৩৩.১ লাখ ভোটারের সমস্যাকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

১. নন-ম্যাপিং (No Mapping): প্রায় ১৩,৭৯,৭৮৫ জন ভোটারের নাম আগের মাস্টার ডেটার সঙ্গে সরাসরি মিলছে না।

২. লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি (Logical Discrepancies): প্রায় ১৯,৩৩,১৩৪ জন ভোটারের ক্ষেত্রে বয়স, পারিবারিক সম্পর্ক বা পরিচয়ে প্রযুক্তিগত ও তাত্ত্বিক ভুল পাওয়া গিয়েছে।

যেমন, নয়াদিল্লি বিধানসভার অন্তর্গত সরোজিনী নগরের একটি মাত্র বুথের তথ্য খতিয়ে দেখে দেখা গিয়েছে, সেখানে ৮৪ জন ভোটারের নথিতে ভুল রয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার নামে অসামঞ্জস্য, ৭টি ক্ষেত্রে সন্তান ও বাবা-মায়ের নথিভুক্ত বয়সের তফাৎ ৯ মাসেরও কম, এবং একটি নথিতে সন্তান ও অভিভাবকের বয়সের ব্যবধান ৫০ বছরের বেশি বলে দেখাচ্ছে!

খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা কমলো ৩২.৮ শতাংশ

বিপুল পরিমাণ ভুল ও ভুয়া তথ্য সংশোধনের ফলে দিল্লির মোট ভোটার সংখ্যায় বিরাট পরিবর্তন এসেছে। গত ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দিল্লিতে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,৪৫,১০,২৯৯ জন। কিন্তু ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া তালিকায় সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭,৫৩,৫৭৭ জনে। অর্থাৎ, কমিশনের কড়া ছাঁকনিতে ভোটার সংখ্যা একধাক্কায় প্রায় ৩২.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পাশাপাশি, প্রশাসনিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে দিল্লির ৭০টি বিধানসভা কেন্দ্রে নতুন করে ভোটকেন্দ্র পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। আগের ১৩,০ ৩৩টি বুথ থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে এখন মোট ১৪,৯৪৭টি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, নোটিসপ্রাপ্ত সমস্ত নাগরিককে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে হাজির হয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেশ করে নিজেদের ভোটাধিকার ও তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

Rick Sarkar
  • Rick Sarkar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *