পুজোর মুখে কোটি টাকার ব্যবসার বাজারে মন্দা! তলানিতে দাম, পদ্মচাষিদের চরম আশঙ্কার গল্প

সামনেই পুজো, অথচ দর নেই পদ্মের! কোটি টাকার ব্যবসার বাজারে মাথায় হাত হুগলির চাষিদের
ঢাকের বাদ্যি আর কাশফুলের মিষ্টি গন্ধ জানান দিচ্ছে মা দুর্গার আগমন বার্তা। আর দেবী দুর্গার আরাধনার অন্যতম প্রধান ও আবশ্যিক উপকরণ হলো পদ্মফুল। প্রথা অনুযায়ী ১০৮টি পদ্ম ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায় মহাপূজা। উৎসবের এই মরশুমে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পদ্মের চাহিদা থাকে আকাশছোঁয়া। তবে চাহিদা থাকলেও চলতি বছরে একেবারে উল্টো চিত্র ধরা পড়েছে পদ্মের হাটে। বাজার ভরা থাকলেও মিলছে না উপযুক্ত দাম, অন্যদিকে খামখেয়ালী আবহাওয়ার কোপে কমেছে ফলনও। সব মিলিয়ে মারাত্মক লোকসানের আশঙ্কায় দিন গুনছেন হুগলি জেলার পদ্মচাষিরা।
হুগলির আড়াই হাজার বিঘা জমিতে চাষ, কোটি টাকার ব্যবসা
হুগলি জেলার পান্ডুয়া, পোলবা, বলাগড় এবং খন্যানের তাম্বাগ্রাম—এই বিশাল বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় আড়াই হাজার বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পদ্মের চাষ হয়। শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার কিংবা কলকাতার বিখ্যাত মল্লিকঘাট ফুল বাজারই নয়, খন্যান থেকে এই পদ্ম প্রতিদিন পৌঁছে যায় মুম্বই, চেন্নাই, হায়দরাবাদ এমনকী দিল্লির মতো মেট্রো শহরগুলোতে। খবর সূত্রে জানা যায়, স্বাভাবিক সময়ে পুজোর মরশুমে এই তাম্বাগ্রাম এলাকা থেকেই কোটি টাকার ওপর পদ্মের ব্যবসা লেনদেন হয়।
ফলন কম, দাম মাত্র ২ টাকা! ক্ষোভে ফুটছেন চাষিরা
চাষিদের অভিযোগ, এবার প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন বেশ ব্যাহত হয়েছে। যেটুকু ফলন হচ্ছে, তারও বাজারদর মিলছে না। ১২ বিঘা জমিতে পদ্ম চাষ করা তাম্বার স্থানীয় চাষি রাজেশ্বর বিশ্বাস জানান, “আবহাওয়ার মারের পর এবার যা ফলন হয়েছে, তাতে আসল খরচের টাকাই উঠবে কি না সন্দেহ। আমরা চরম দুশ্চিন্তায় আছি।”
অন্য এক চাষি গুরুপদ মাঝির মতে, তাঁদের ফুল বিদেশেও রপ্তানি হয়, তবুও স্থানীয় বাজারে সঠিক দাম মিলছে না। তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করে ফুলের একটি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ীদের পরিস্থিতিও খুব একটা আলাদা নয়। ব্যবসায়ী মন্টু দেবনাথ ও অরুণ বিশ্বাসের কথায়, বর্তমানে এক-একটি পদ্ম মাত্র দেড় থেকে দু’টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ অন্তত ৫ থেকে ৬ টাকা দর না পেলে চাষি এবং ব্যবসায়ী কারও লাভ থাকে না। চাষিদের বক্তব্য, ধান বা অন্য ফসলের চেয়েও পদ্ম চাষে প্রচুর শ্রমিক কাজ করেন, ফলে বহু মানুষের রুজিরুটি জড়িয়ে রয়েছে এই শিল্পে।
হিমঘরের আশ্বাস বিধায়কের
চাষিদের এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছেন পান্ডুয়ার বিজেপি বিধায়ক তুষার মজুমদার। তিনি জানান, আগের তুলনায় বর্তমানে জমিতে কৃত্রিমভাবে পদ্মের চাষ অনেক বেড়েছে। কৃষকরা যাতে পুজোর বাজার লক্ষ্য করে ফুল দীর্ঘদিন সংরক্ষণে রাখতে পারেন, সেজন্য এলাকায় একটি বিশেষ হিমঘর (Cold Storage) তৈরির প্রচেষ্টা চালাবেন তিনি। পাশাপাশি চাষিদের সবরকম সরকারি সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
উৎসবের মরশুমে যখন আলোয় সাজছে চারিদিক, তখন দেবী দুর্গার চরণ ছোঁয়া ফুলের স্রষ্টাদের ঘরে ঘরে জমছে চরম অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। এখন দেখার, সরকারি সহায়তায় তাঁদের এই সংকট কাটে কি না।