উৎসবের আলোয় লুকিয়ে রক্তের দাগ! বলিউডের কোন কোন ছবিতে গণেশ চতুর্থী মানেই ভয়ঙ্কর মোড়?

গণেশ চতুর্থী মানেই মুম্বইয়ের রাস্তায় উৎসবের এক বাঁধভাঙা জোয়ার। ঢাক-ঢোল, ভক্তিভরা আরতি, জমজমাট প্যান্ডেল, বিসর্জনের বর্ণাঢ্য মিছিল আর চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়ানো ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’ ধ্বনি—সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় আবহ। এই চিরচেনা উৎসবের আমেজ বহুবার রূপোলি পর্দায় জাদুকরিভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নির্মাতারা। তবে কিছু কিছু হিন্দি ছবিতে গণেশ পুজো নিছক কোনো উদযাপনের দৃশ্য হয়ে থাকেনি; বরং তা গল্পের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে যে, সেই দৃশ্য বাদ দিলে ছবির মূল আবেগ ও ক্লাইম্যাক্সই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
রাম গোপাল বর্মার ‘সত্য’ ও অন্ধকারময় ক্লাইম্যাক্স
এই তালিকায় সবার আগে নাম আসে রাম গোপাল বর্মার কালজয়ী ছবি ‘সত্য’ (Satya)-র। এই ছবিতে গণেশ চতুর্থী এক ভয়ঙ্কর ও মর্মান্তিক রূপ নিয়ে হাজির হয়েছিল। মুম্বইয়ের বিশাল গণেশোৎসবের কোলাহল ও ভিড়ের মাঝেই ছবির ক্লাইম্যাক্সের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি ঘটে। সমুদ্রসৈকতে উৎসবের উন্মাদনার মধ্যেই সত্যকে হত্যা করা হয়। এরপর অপরাধজগত থেকে পালানোর চেষ্টা, প্রিয়জনের কাছে শেষবার পৌঁছানোর আকুতি এবং এক করুণ মৃত্যুর পরিণতি—সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দের মাঝেই তৈরি হয়েছিল এক অন্ধকার ও রক্তাক্ত আবহ।
‘বাস্তব’ থেকে ‘অগ্নিপথ’: প্রতিশোধ ও অপরাধের সংঘাত
মহেশ মঞ্জরেকরের ‘বাস্তব: দ্য রিয়্যালিটি’ (Vaastav: The Reality) ছবিতেও গণপতি উৎসবের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সঞ্জয় দত্তের বিখ্যাত রঘু চরিত্রের অপরাধজগতের অন্ধকার জগৎ ও তার ভিতরের মানসিক দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তুলেছে এই পুজোর আবহ। ছবির ‘শেন্দুর লাল চঢ়ায়ো’ আজও অন্যতম স্মরণীয় গণেশ বন্দনা হিসেবে ভক্তদের মনে গেঁথে রয়েছে।
অন্যদিকে, হৃতিক রোশন অভিনীত ‘অগ্নিপথ’ (Agneepath) ছবিতে গণেশ চতুর্থী যেন বিজয় ও প্রতিশোধের স্পৃহাকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। ‘দেবা শ্রী গণেশা’ গানটি শুধু একটি জনপ্রিয় ট্র্যাক নয়, বরং এটি ছবির অন্যতম শক্তিশালী আবেগঘন মুহূর্ত। উৎসবের ভিড়ের মধ্যেই এগিয়ে চলে বিজয় চৌহানের প্রতিশোধের মূল গল্প। ১৯৯০ সালের মূল ছবি হোক বা ২০১২ সালের রিমেক—উভয় ক্ষেত্রেই গণেশোৎসব বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল।
ডন, বাজিরাও ও তারুণ্যের নাচ
ফারহান আখতারের ‘ডন: দ্য চেজ বিগিনস এগেন’ (Don) ছবিতে গণেশোৎসবের সঙ্গে মিশেছিল টানটান রহস্য, অ্যাকশন এবং চরিত্রের পরিচয়। ‘মৌরিয়া রে’ গানের আবহে শাহরুখ খানের ডন এবং বিজয়কে ঘিরে তৈরি হওয়া দৃশ্যটি উৎসবের উন্মাদনার মধ্যেও দর্শকের মনে আলাদা ছাপ ফেলেছিল।
সঞ্জয় লীলা ভন্সালীর ‘বাজিরাও মাস্তানি’ (Bajirao Mastani) ছবিতে গণেশোৎসব পেয়েছিল এক সম্পূর্ণ রাজকীয় ও বর্ণাঢ্য রূপ। ‘গজাননা’ গানের বিশাল আয়োজন এবং সেটের মধ্যে পেশোয়া বাজিরাওকে ঘিরে চলা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েন ছবির নাটকীয়তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে, ‘এবিসিডি’ (ABCD) ফ্র্যাঞ্চাইজিতে গণেশপুজো সরাসরি তারুণ্য, দলগত লড়াই এবং নাচ ও পারফরম্যান্সের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
সলমন খানের ‘ওয়ান্টেড’-এর ‘জালওয়া’, রিতেশ দেশমুখের ‘বানজো’-র ‘বাপ্পা’ কিংবা ‘জুড়ওয়া ২’-এর গানগুলি প্রমাণ করে যে, মুম্বইয়ের গণেশোৎসব হিন্দি সিনেমার নিজস্ব ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতির কতটা গভীর অঙ্গ। তবে উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে ‘সত্য’-র সেই রক্তাক্ত ক্লাইম্যাক্স আজও মনে করিয়ে দেয় যে, বলিউড ঠিক কতটা সুনিপুণভাবে গণেশ চতুর্থীর আলো ও বিসর্জনের আবহের আড়ালে জীবনের নানা রূপ—কখনও আনন্দ, কখনও প্রেম, আবার কখনও বা মৃত্যুর ছায়াকে সফলভাবে পর্দায় তুলে ধরেছে।