সময়ের চাকা ঘুরল ১৮০ ডিগ্রি! এবার ভারতের তৈরি পেট্রোলের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে রাশিয়াকে, তোলপাড় বিশ্ববাজার

সময়ের চাকা কীভাবে বদলে যায়, তা ভারত ও রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় ভারত তার মোট প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের মাত্র ২ শতাংশ রাশিয়া থেকে আমদানি করত। কিন্তু ২০২২ সালের পর পরিস্থিতি এমনভাবে পাল্টায় যে, ভারতের ৪০ শতাংশেরও বেশি তেল আসতে শুরু করে রাশিয়া থেকেই। ফলে ভারত হয়ে ওঠে রুশ অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা।
তবে এবার সেই সময়ের চাকা আবার ঘুরেছে! ইউক্রেনের টানা ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার (Oil Refinery) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সে দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। ফলস্বরূপ, এবার পেট্রোল ও ডিজেলের জন্য ভারতকে রাশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে এ সংক্রান্ত যে তথ্য সামনে এসেছে, তা পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।
রাশিয়াকে রেকর্ড পেট্রোল পাঠাল ভারত
‘সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার’ (CREA)-এর সাম্প্রতিক মাসিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে রাশিয়া রেকর্ড ১.৭২ লাখ টন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি করেছে। যার মধ্যে সিংহভাগই ছিল ভারত থেকে পাঠানো জ্বালানি। আগস্ট মাসে রাশিয়ার মোট আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই সরবরাহ করেছে ভারত।
ভারত এই এক মাসেই রাশিয়াকে ১.২০ লাখ টন পেট্রোল পাঠিয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭.৮ কোটি ইউরো। পরিসংখ্যান বলছে, আগস্ট মাসে রাশিয়ার তেলের এই আমদানির পরিমাণ এর আগের সব মাসের রেকর্ডকে সাত গুণ ছাপিয়ে গেছে এবং পুরো ২০২৫ সালের মোট আমদানির তুলনায় তা প্রায় তিন গুণ বেশি।
কোন শোধনাগার থেকে গেল এই জ্বালানি?
রিপোর্টে বলা হয়েছে, গুজরাটের ভাদিনারে অবস্থিত ‘নয়রা এনার্জি’ (Nayara Energy)-র শোধনাগারেই এই পেট্রোল তৈরি করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, রাশিয়ার সরকারি তেল সংস্থা ‘রসনেফ্ট’ (Rosneft)-এর কাছে এই নয়রা এনার্জির ৪৯.১৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে।
CREA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ভাদিনার শোধনাগারে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের ১০০ শতাংশই এসেছিল রাশিয়া থেকে। অর্থাৎ, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে রাশিয়া নিজের আংশিক মালিকানাধীন ভারতীয় শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল পাঠাচ্ছে, সেখানে তা পেট্রোলে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং ঘরোয়া চাহিদা মেটাতে সেই পেট্রোল আবার সমুদ্রপথে ঘুরিয়ে নিজেদের দেশে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
কীভাবে রাশিয়ায় পৌঁছাল এই পেট্রোল?
ভাদিনার থেকে রওয়ানা দেওয়া পেট্রোলের চালানগুলি প্রথমে মিসর উপকূলে মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে (Ship-to-Ship Transfer) স্থানান্তরিত করা হয়। এরপর সেখান থেকে তা পাঠানো হয় রাশিয়ার ‘বেলোয়ে মোরে’ (Beloye More) বন্দরে।
এর নেপথ্যে প্রধান কারণ ইউক্রেনের লাগাতার ড্রোন হামলা। ইউক্রেনীয় ড্রোন আক্রমণে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ তেল শোধনাগার ও জ্বালানি পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রফতানিকারক দেশ হলেও, আগস্ট মাসে তাদের মোট আমদানির ৭৪ শতাংশই ছিল পেট্রোল।
আর কোন কোন দেশ থেকে তেল কিনছে রাশিয়া?
আগস্ট মাসে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে রাশিয়া ১৮,০০০ টন তেলজাত পণ্য আমদানি করেছে (যার বেশিরভাগই ছিল গ্যাসঅয়েল)। এছাড়া মিসর থেকে প্রায় ২৫,০০০ টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ১.৬ কোটি ইউরো।
অনুপাতে, আগস্ট মাসে সমুদ্রপথে রাশিয়ার তেলজাত পণ্য রফতানির পরিমাণ আগের তুলনায় ২১ শতাংশ কমে গেছে। বিশেষ করে তুপসে (Tuapse) বন্দরের মতো প্রধান রফতানি কেন্দ্রগুলি মে মাস থেকে ইউক্রেনীয় হামলার শিকার হওয়ায় আগস্ট মাসে সেখান থেকে কোনো তেলের চালান বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি।