ডলারকে বাই বাই নয়! ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের কোন চালে চমকে গেল গোটা বিশ্ব?

২০২৬ সালের ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনের আয়োজক ভারত। আর এই মেগা ইভেন্ট ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের সমস্ত লাইটলাইট এখন দিল্লির ওপর। বিশেষ করে, ডলার-বিরোধী জোট গড়ার যে আলোচনা ব্রিকস জোটের অন্দরে ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, সেই পথে ভারত কতটা হাঁটবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে ভারতের অবস্থান এখনও পর্যন্ত স্ফটিকস্বচ্ছ—মার্কিন ডলারকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই। বরং আন্তর্জাতিক লেনদেনকে আরও বেশি সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে তুলতে অত্যাধুনিক ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি।

চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ডি-ডলারাইজেশন বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে জোর সওয়াল করে আসছে। এমনকি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাও এই বিষয়ে বেশ সোচ্চার। কিন্তু ভারত সেই পথে পুরোপুরি পা বাড়াতে নারাজ। দেশের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ডলারকে সরাসরি নিশানা করা ভারতের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কোনো কৌশলগত নীতির অংশ নয়। অর্থাৎ, বিশ্ব বাণিজ্যে ডলারের অতিরিক্ত একাধিপত্য নিয়ে ভারতের কিছু উদ্বেগ অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তাই বলে রাতারাতি তাকে উপড়ে ফেলার কোনো অভিযান চালাতে চায় না দিল্লি।

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নতুন মাস্টারপ্ল্যান

তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকস জোটের আর্থিক সহযোগিতার কোনো উদ্যোগ থেকেই ভারত দূরে থাকছে। বরং আরও নির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী একটি প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ব্রিকস-এর সদস্য দেশগুলির সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি বা CBDC-গুলিকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এবারের সম্মেলনের মূল আলোচ্যসূচিতে রাখার জোরালো সুপারিশ করেছে আরবিআই। এই প্রস্তাব পাস হলে ব্রিকস নেতাদের সামনে এই ধরনের ডিজিটাল উদ্যোগ একেবারে প্রথমবার অফিশিয়ালি উত্থাপিত হবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের রিও ডি জেনেইরো সম্মেলনে ব্রিকস-এর পক্ষ থেকে সদস্য দেশগুলির পেমেন্ট সিস্টেমগুলির মধ্যে আরও উন্নত ইন্টারঅপারেবিলিটির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। ভারতের এই সিবিডিসি প্রস্তাব সেই ভাবনাকেই এক লহমায় বাস্তবে রূপ দিতে পারে। এর মূল লক্ষ্য হবে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাণিজ্য ও পর্যটন সংক্রান্ত লেনদেনে সময়, খরচ এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো।

বাণিজ্য ঘাটতি ও বাস্তবসম্মত নীতি

তবে এই পথেও বেশ কিছু বড়সড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সিবিডিসি-গুলিকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চাইলে দরকার সঠিক প্রযুক্তিগত মান, পোক্ত প্রশাসনিক কাঠামো, নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং লেনদেনের স্বচ্ছ নিয়ম। পাশাপাশি ব্রিকস জোটের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ভারসাম্যও বর্তমানে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরও বেশি প্রকট। ব্রিকস-এর বাকি সদস্য দেশগুলির সঙ্গে ভারতের বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি ২২৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, ভারত এই দেশগুলোর কাছ থেকে যতটা মালপত্র বা পরিষেবা কেনে, তার তুলনায় অনেক কম রপ্তানি করে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ালেও একটি নির্দিষ্ট পক্ষের হাতে অন্য পক্ষের মুদ্রা বিপুল পরিমাণে জমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। অতীতে রাশিয়ার সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছিল ভারতকে।

প্রবীণ অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল হুট করে ডলার বাদ দিলেই সমস্ত সমস্যার জাদুকরি সমাধান হয়ে যাবে না। এর জন্য ভীষণভাবে প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত লিকুইডিটি, অভিন্ন সেটেলমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড এবং মুদ্রার অতিরিক্ত জমা সহজে সামলানোর কার্যকর গাইডলাইন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ২০২৬-এর ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের বার্তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। দিল্লি হুট করে ডলারকে সরিয়ে নতুন কোনো বিকল্প ব্রিকস মুদ্রা চালুর তাড়াহুড়োয় নেই। বরং যেখানে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করাটা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত, ঠিক সেখানেই তা বাড়ানো, প্রয়োজনে সোয়াপ লাইন ব্যবহার করা এবং পরীক্ষামূলকভাবে সিবিডিসি সংযোগ চালু করার পথেই হাঁটতে চাইছে ভারত। অর্থাৎ, বিশ্ব বাণিজ্য থেকে ডলারকে পুরোপুরি হটিয়ে দেওয়ার বদলে লেনদেনের মূল ‘পাইপলাইন’ আরও বেশি গতিশীল ও কার্যকর করাই এখন ভারতের আসল লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *