শত ডলার ছাড়াল ব্যারেল! আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের আঁচে বিশ্ব বাজারে হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত মারাত্মক আকার ধারণ করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বজুড়ে সাধারণ উপভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। জুলাই মাসের পর এই প্রথম তেলের দাম তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছাল। বাজারের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১০১.২১ ডলারে। ঠিক তার পিছুেই রয়েছে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ক্রুড, যার দাম পৌঁছেছে প্রতি ব্যারেল ৯৬.০৫ ডলারে। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত তেল কেন্দ্রগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং জলপথে জাহাজে ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চল-মান আমেরিকা ও ইরান সংঘাত ইতিমধ্যেই ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বাজারকে অস্থির করে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কায় তেলের দাম ফের ১০০ ডলারের ঘরে ফিরে আসায় অর্থনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এই চড়া দাম বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত ও তীব্র করে তুলবে।গ্যাসোলিন এবং ডিজেলের মতো জ্বালানির মূল উপাদান হলো এই অপরিশোধিত তেল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এগুলোর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। জ্বালানির এই ঊর্ধ্বমুখী দাম বিশ্ব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন, ওষুধ ও গৃহস্থালি সামগ্রীর পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন যাতায়াত এবং বিমান ভাড়াও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গ্লোবাল ব্রোকার এফএক্সটিএম-এর বাজার গবেষণা প্রধান লুকমান ওতুনুগা জানান, ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া বাজারের জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা, তবে এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়তে চলেছে মুদ্রাস্ফীতির ওপর। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই অপরিশোধিত তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এই লড়াইয়ের জেরে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে নৌ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যেখান দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যাতায়াত করত। গত ছয় মাসে তেলের দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একসময় প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল। বসন্তকালে টানা এক মাস দাম ১০০ ডলারের উপরে থাকার পর, গ্রীষ্মের শুরুতে একটি সম্ভাব্য শান্তির আশίয় বাজার কিছুটা শান্ত হয় এবং দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্তর অর্থাৎ ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলারে নেমে আসে। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর নতুন করে হামলা শুরু হলে তেলের বাজার ফের চড়তে শুরু করে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের জেরে মার্কিন বাহিনী সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ইরানি তেল ট্যাঙ্কার ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি, ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। বিকল্প বাণিজ্য পথগুলোকে নিশানা করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ তলানিতে ঠেকেছে, যা আগামী দিনে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *