বৃষ্টিভেজা রোমাঞ্চকর ডার্বি, মোহনবাগানকে রুখে দিল এক গোল পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল

আট বছর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বারাসতে ফিরল ফুটবল। আর সেই প্রত্যাবর্তনের রাতেই লেখা হলো নতুন ইতিহাস। প্রায় ১৬ বছর পর বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনের ফ্লাডলাইটে ফিরল বড় ম্যাচ, আর এই মাঠেই এই প্রথম আয়োজিত হলো ঐতিহাসিক ডার্বি। ম্যাচ শুরুর বহু আগেই বারাসতের বাতাসে টের পাওয়া যাচ্ছিল অন্যরকম উত্তাপ। গ্যালারি থেকে মাঠ—সর্বত্র অপেক্ষা ছিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী থাকার। শেষ পর্যন্ত জয় কারও ঘরে না এলেও বৃষ্টি, কাদা, জলমগ্ন মাঠ আর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ১-১-এর এই ডার্বি যেন জয়ের সংজ্ঞাটাই বদলে দিল। শক্তিশালী মোহনবাগানের বিরুদ্ধে এক গোল পিছিয়ে থেকেও যেভাবে তরুণ ইস্টবেঙ্গল লড়াইয়ে ফিরে এল, তাতে এই এক পয়েন্টও লাল-হলুদের কাছে তিন পয়েন্টের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

বৃষ্টিতে জলমগ্ন বারাসত, ফুটবল হয়ে উঠল যুদ্ধ

সোমবার দুপুর গড়িয়ে ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টিতে মুহূর্তে বদলে যায় বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনের চেহারা। মাঠ ভারী হয়ে ওঠার পাশাপাশি জায়গায় জায়গায় জমে যায় জল। গোলপোস্টের সামনে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। মাটিতে পড়ে বল আর স্বাভাবিকভাবে গড়াচ্ছিল না, জলের মধ্যে আটকে কখনও থমকে যাচ্ছিল, কখনও আবার আচমকাই গতি হারাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ফুটবল খেলা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ছোট পাস, দ্রুত গতির আক্রমণ কিংবা মাটিতে বল রেখে খেলার পরিকল্পনা—সবই আটকে যায় জলের ফাঁদে। বাধ্য হয়েই দুই দলকে বারবার লম্বা ও ভাসানো বলে খেলতে হয়।

এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেই আলাদা করে নজর কাড়ে ইস্টবেঙ্গল। বহু যুগ পর ডার্বির প্রথম একাদশে ১১ জন বাঙালি ফুটবলারকে মাঠে নামায় লাল-হলুদ শিবির। এক ঝাঁক তরুণ বাঙালি ফুটবলার নিয়ে তৈরি এই দল শুরুতেই বুঝিয়ে দেয়, বড় ম্যাচে লড়াই করতে শুধু তারকা নাম বা অভিজ্ঞতা লাগে না; সাহস ও জেদ থাকলে তারুণ্যও বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, মোহনবাগান একাদশে প্রায় ছ’জন সিনিয়র ফুটবলারকে রেখে মাঠে নেমেছিল। কিয়ান নাসিরিকে ধরলে সেই সংখ্যাটা আরও বাড়ে। অভিজ্ঞ ও তারুণ্যের এই লড়াইয়ে প্রথমার্ধে অবশ্য কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল লাল-হলুদ। অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতার সুযোগ নিয়ে ৩৮ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে সাহালের বাড়ানো বল ধরে দ্রুত গোলের দিকে এগিয়ে যান মনবীর সিং। অঙ্কনকে কাটিয়ে তাঁর বাঁ পায়ের জোরালো শট সোজা জালে জড়িয়ে গেলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মোহনবাগান। এর আগেও একাধিক সুযোগ তৈরি করেছিল সবুজ-মেরুন, তবে গোলকিপার গৌরব সাউয়ের দৃঢ়তায় ব্যবধান আর বাড়েনি।

বিরতির পর রূপ বদল, মহাতারকাদের আটকে বীরের মতো কামব্যাক

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে ধরা দেয় ইস্টবেঙ্গল। প্রথমার্ধের রক্ষণাত্মক খোলস ছেড়ে আরও সাহস নিয়ে সামনে উঠতে শুরু করে তারা। এর মাঝেই ৫৫ মিনিটে চোট পেয়ে মনোতোষ মাঝি মাঠ ছাড়লে বদলি হিসেবে নামেন কেরালার মহম্মদ বিলাল। ঠিক তার দশ মিনিট পরেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। ৬৫ মিনিটে কর্নার থেকে বিজয় মুর্মুর মাপা শটে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন বিলাল। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে লাল-হলুদ গ্যালারি। খেলার ফল ১-১ হতেই ম্যাচের উত্তাপ চরমে পৌঁছায়।

শেষের দিকে জয়ের জন্য মোহনবাগান আক্রমণের ঝড় তুললেও ইস্টবেঙ্গলের শেষপ্রহরী হয়ে দাঁড়ান গৌরব সাউ। প্রথমার্ধের ভুল শুধরে একের পর এক নিশ্চিত গোলের সুযোগ আটকে দেন তিনি। অন্তত তিনটি বড় গোল বাঁচিয়ে দলের মান রক্ষা করেন এই তরুণ গোলকিপার। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্কোরবোর্ডে ১-১ লেখা উঠলেও এই ড্রয়ের অর্থ দুই শিবিরের কাছে একেবারেই আলাদা। তরুণদের লড়াকু মানসিকতা আর গ্যালারির সঙ্গে ‘বাইকিং ক্ল্যাপ’-এ মেতে ওঠার আনন্দ প্রমাণ করে দিল, তিন পয়েন্ট না পেলেও ডার্বির আসল নৈতিক জয়টা ছিনিয়ে নিয়েছে ইস্টবেঙ্গলই। এই ড্রয়ের সুবাদে ১১ ম্যাচে আটটি জয় এবং তিন ড্রয়ে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে লিগের গ্রুপ পর্বের শীর্ষস্থান দখল করেই মাঠ ছাড়ল লাল-হলুদ। অন্যদিকে, সমান ম্যাচে ২৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করে তৃতীয় স্থানে থেকে লিগ শেষ করল মোহনবাগান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *