যুদ্ধে টাকা ফুরাতেই অভাবনীয় পদক্ষেপ! কোষাগার ভরতে পর্নোগ্রাফি শিল্পকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে ইউক্রেন?

রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ইউক্রেন। একটানা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গিয়ে দেশের কোষাগার প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। আর এই বিপুল প্রতিরক্ষা ব্যয়ের খরচ জোগাতে এবার এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর পরিকল্পনা করে ফেললেন ভলোদিমির জেলেনস্কির দেশ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের সামরিক বাহিনীকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে এবার পর্নোগ্রাফি শিল্পকে বৈধতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ইউক্রেন সরকার। শুধু তাই নয়, এই লাভজনক শিল্পটিকে কড়া কর কাঠামোর আওতায় আনার কথাও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।

পর্নোগ্রাফি শিল্প নিয়ে বর্তমান আইনি জটিলতা

উল্লেখ্য, বর্তমানে ইউক্রেনের প্রচলিত আইনে পর্নোগ্রাফি নির্মাণ, বিতরণ বা নিজের কাছে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। এই অপরাধের জন্য দেশটিতে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু নতুন করে কর আদায় করা নয়, এর পাশাপাশি এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের আইনি জটিলতা দূর করা এবং দুর্নীতি মোকাবিলা করাও বটে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পুলিশি কড়াকড়ি বা নানা চেষ্টা সত্ত্বেও এই শিল্পটিকে ইউক্রেনে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। আড়ালে-আবডালে ঠিকই ভিডিও এবং প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট তৈরির কাজ রমরমিয়ে চলছে। তাই শেষ পর্যন্ত এই শিল্পকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রের কোষাগার সমৃদ্ধ করার পথেই হাঁটছে কিয়েভ।

আইনি লড়াই ও সম্ভাব্য রাজস্ব আয়

ইউক্রেনের বিরোধী দলের নেতা তথা সংসদের অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক এই পর্নোগ্রাফিকে বৈধ করার পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর উদ্যোগে আনা একটি বিশেষ বিল ইতিমধ্যেই গত জুলাই মাসে ইউক্রেনীয় সংসদের প্রথম ভোটে পাস হয়ে গেছে এবং বর্তমানে এটি দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত ভোটের অপেক্ষায় রয়েছে। ঝেলেজনিয়াকের জোরালো অনুমান, এই প্রাপ্তবয়স্কদের শিল্পকে আইনি বৈধতা দিয়ে যদি সঠিক উপায়ে কর আরোপ করা যায়, তবে ইউক্রেন সরকার প্রতি বছর প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারবে।

যদিও ইউক্রেনের ঘোষিত বার্ষিক প্রতিরক্ষা চাহিদার বিশাল অঙ্ক অর্থাৎ প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই ২৫ মিলিয়ন ডলার অত্যন্ত সামান্য মনে হতে পারে। তবে ঝেলেজনিয়াকের দাবি, এই সমপরিমাণ অর্থ দিয়েও দেশের সুরক্ষার জন্য প্রায় ৩০,০০০ উন্নত ড্রোন কেনা সম্ভব। এছাড়া এই বিলের সমর্থকরা জোরালোভাবে বিশ্বাস করেন যে, অন্ধকার জগতের হাত থেকে এই শিল্পকে আলোয় আনলে এর আড়ালে চলা অপরাধ ও দুর্নীতি অনেকটাই দমন করা সম্ভব হবে।

অনলিফ্যানস বিতর্ক ও কর ব্যবস্থার চাপ

জনপ্রিয় কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘অনলিফ্যানস’-এর মূল সংস্থা ‘ফিনিক্স ইন্টারন্যাশনাল’ থেকে ইউক্রেনীয় কর কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু তথ্য হাতে পাওয়ার পরেই বিষয়টি নিয়ে জোর শোরগোল শুরু হয়। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে একা ইউক্রেন থেকেই প্রায় ৭,৯০০ জন ক্রিয়েটর ‘অনলিফ্যানস’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ১৩১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছিলেন। এই বিপুল অংকের আয় সামনে আসার পরেই নড়েচড়ে বসে প্রশাসন এবং পরবর্তীতে ওই সমস্ত ক্রিয়েটরদের কাছে নোটিশ ও চিঠি পাঠাতে শুরু করে কর কর্তৃপক্ষ।

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, যাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতি মাসে ২০,০০০ ডলারের বেশি আয় করতেন, তাঁরা এখন এক অদ্ভুত আইনি প্যাঁচে পড়েছেন। কারণ, এই আয় সরকারিভাবে ঘোষণা করলে তাঁদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অবৈধ পর্নোগ্রাফি তৈরির দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। এই প্রসঙ্গে ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক বলেন, দেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কার্যত দুটি কঠিন বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হয় তাঁদের কর না দিয়ে ট্যাক্স সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হতে হবে, অথবা কর দিয়ে দেশের বর্তমান আইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত কার্যকলাপের কথা স্বীকার করে নিতে হবে। এই জটিল জট কাটাতে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন সংসদ এই পর্নোগ্রাফি বৈধকরণের বিলটি পাস করায় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *