ডিএনএ রিপোর্ট থাকলেই ধর্ষণ প্রমাণিত হয় না! দিল্লি হাইকোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে শোরগোল

ডিএনএ (DNA) রিপোর্টে পুরুষ ও মহিলার মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের প্রমাণ মিলতে পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মতিতে হয়েছিল নাকি জোর করে স্থাপন করা হয়েছিল, তা শুধুমাত্র ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। একটি ধর্ষণ মামলার শুনানিতে এমনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল দিল্লি হাইকোর্ট।

দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি মধু জৈন এই মামলার শুনানি শেষে অভিযুক্ত ব্যক্তির বেকসুর খালাসের রায় বহাল রেখেছেন। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এক মহিলাকে বারবার ধর্ষণ, নেশাজাতীয় পদার্থ খাইয়ে যৌন নির্যাতন, হুমকি এবং অস্বাভাবিক যৌন আচরণের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল। মামলার ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, ওই মহিলার সন্তানের জৈবিক পিতা অভিযুক্ত ব্যক্তিই। তবে আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ডিএনএ রিপোর্ট কেবল যৌন সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বা তাতে মহিলার সম্মতি ছিল কি না, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় না।

ঠিক কী ছিল অভিযোগ?

এফআইআর বা প্রাথমিক তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্যাতিতার পরিবারের পূর্বপরিচিত ছিলেন। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন হুমকি ও প্রলোভন দেখিয়ে মহিলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ। এমনকি একবার নেশাজাতীয় পদার্থ খাইয়েও তাঁকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

এর জেরে ওই মহিলা গর্ভবতী হন এবং ২০১৯ সালের জুন মাসে একটি সন্তানের জন্ম দেন। তদন্তের স্বার্থে মহিলা, অভিযুক্ত এবং শিশুর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ফরেন্সিক রিপোর্টে অভিযুক্তকেই শিশুটির প্রকৃত বাবা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে শারীরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন যে তাঁদের মধ্যে সম্পূর্ণ সম্মতিতেই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং বিষয়টি মহিলার স্বামীরও জানা ছিল।

ট্রায়াল কোর্টের রায়ই বহাল রাখল হাইকোর্ট

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে নিম্ন আদালত বা ট্রায়াল কোর্ট অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করেছিল। সেই রায়ের বিরুদ্ধেই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন অভিযোগকারিণী। এ দিন হাইকোর্ট জানায়, ট্রায়াল কোর্ট শুধুমাত্র ডিএনএ (DNA) রিপোর্টের ওপর চোখ বন্ধ করে সিদ্ধান্ত নেয়নি। শারীরিক সম্পর্কের পাশাপাশি সেই সম্পর্কের পেছনের পরিস্থিতি, সম্মতি ছিল কি না, হুমকি দেওয়া হয়েছিল কি না এবং নেশাজাতীয় পদার্থ প্রয়োগের অভিযোগ—সব দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছিল।

আদালতের নজরে আসে যে, অভিযোগকারিণীর বয়ানে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। বিশেষ করে প্রথম ঘটনার সময় তিনি কতটা সচেতন ছিলেন বা নেশার প্রভাবে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে ফারাক দেখা যায়। এছাড়া গর্ভধারণ ও সন্তানের পিতৃত্বের দাবি নিয়েও তাঁর বক্তব্যে অসংগতি ধরা পড়ে।

তবে আদালত এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, অভিযোগকারিণীর আচরণকে প্রচলিত কোনও সামাজিক ধারণার মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না এবং মামলা করতে দেরি হওয়া মানেই যে অভিযোগ মিথ্যা, তাও নয়। তবে সমস্ত প্রমাণ সামগ্রিকভাবে বিচার করেই ট্রায়াল কোর্ট রায় দিয়েছিল এবং সেই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ছিল না। তাই শুধুমাত্র একই প্রমাণের ভিত্তিতে অন্য একটি ব্যাখ্যার সম্ভাবনা থাকতে পারে—এই যুক্তিতে ট্রায়াল কোর্টের খালাসের রায়ে হস্তক্ষেপ করা চলে না। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই অভিযুক্তের বেকসুর খালাসের রায় বহাল রেখেছে দিল্লি হাইকোর্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *