পেন্টাগনে বিরাট বিপর্যয়! পদত্যাগ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সচিবের, ইরান যুদ্ধের মাঝেই ব্যাকফুটে মার্কিন সেনা?

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বা পেন্টাগনের অন্দরে নেতৃত্ব নিয়ে চরম সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের কার্যকালে একের পর এক শীর্ষ সামরিক আধিকারিকদের সরিয়ে দেওয়া ও তাঁদের পদোন্নতিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে বিশ্ব রাজনীতিতে। এদিকে ইরানের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিমধ্যে ছয় মাস অতিক্রান্ত হয়েছে, যার ফলে মার্কিন সেনার ওপর যুদ্ধের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এর মধ্যেই খোদ সেনাসচিবের পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পদত্যাগ করলেন ড্যান ড্রিসকল:
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় সোমবার, যখন সেনাসচিব ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেন। তিনি মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভেন্সের বন্ধু এবং ইয়েল ল’ স্কুলের ব্যাচমেট হিসেবে পরিচিত। অতীতে হেগসেথের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় ছিল। সেনার নেতৃত্ব ও আধুনিকীকরণ সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি নিয়ে হেগসেথের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের মতভেদ চলছিল। ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত অত্যন্ত সংবেদনশীল কूटनीतिक দায়িত্বও তাঁর কাঁধে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ড্রিসকলের এই আচমকা পদত্যাগে মার্কিন সেনার সর্বোচ্চ স্তরে এক বিরাট নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর আগে সেনাপ্রধান জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জকেও পদ থেকে অপসারণ করেছিলেন হেগসেথ। ফলস্বরূপ, বর্তমান ইরান যুদ্ধের মাঝেই সেনার মাথা হিসেবে সেনেট অনুমোদিত কোনো স্থায়ী নাগরিক বা সামরিক নেতৃত্ব আর অবশিষ্ট নেই।

প্রায় গোটা জয়েন্ট চিফস টিমেই রদবদল:
হেগসেথের কার্যকালে প্রায় প্রতিটি সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের হয় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, নতুবা তাঁরা নিজেরাই পদ ছেড়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান, নৌসেনার শীর্ষস্থানীয় অ্যাডমিরাল এবং আর্মি চিফ অফ স্টাফও। ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হেগসেথের আমলে দুই ডজনেরও বেশি সিনিয়র আধিকারিককে অপসারণ করা হয়েছে। জয়েন্ট চিফস-এর মধ্যে বর্তমানে কেবল মাইন কর্পস ও স্পেস ফোর্সের প্রধানরাই টিকে রয়েছেন, যাঁদের হেগসেথ নিজের কার্যকালের শুরুতে দায়িত্বে পেয়েছিলেন।

পাশাপাশি, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে অন্তত ৪৫ জন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের পদোন্নতিতে কোপ বসিয়েছেন হেগসেথ। যা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ, কারণ সাধারণত সেনা আধিকারিকদের পদোন্নতির প্রক্রিয়া রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে হয়ে থাকে। ‘এনবিসি নিউজ’-এর মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে বরখাস্ত বা প্রমোশন আটকে যাওয়া আধিকারিকদের মধ্যে এক ডজনের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক ও মহিলা অফিসারও রয়েছেন।

ইরান যুদ্ধ ও অস্ত্রের ভাঁড়ারে টান:
পেন্টাগনের এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এমন এক সময়ে দানা বেঁধেছে, যখন ইরান যুদ্ধ মার্কিন সেনার যুদ্ধ সক্ষমতার চরম পরীক্ষা নিচ্ছে। ইউরোপ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ল্যাটিন আমেরিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় সেনা আটকে রাখায় বিশ্বের অন্য প্রান্তে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন নৌসেনার মাত্র ২৫ শতাংশ ডেস্ট্রয়ার বর্তমানে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আমেরিকার একমাত্র স্থায়ী বিমানবাহী রণতরীটিকেও মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশের অস্ত্রভাণ্ডারেও। ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’-এর তথ্য জানাচ্ছে, আমেরিকার প্রায় ৬৫ শতাংশ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ইতিমধ্যেই খরচ হয়ে গেছে। এর ফলে ন্যাটো (NATO) সহযোগীদের অস্ত্র সরবরাহ করা এবং ভবিষ্যতে চিনের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধ মোকাবিলার প্রস্তুতিতেও মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

পেন্টাগনের সাফাই ও ট্রাম্পের সমর্থন:
সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে পেন্টাগনের মুখপাত্র শিন পার্নেল মন্ত্রকের অন্দরে কোনো রকম বিশৃঙ্খলার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, জেনারেলদের মধ্যে মতপার্থক্য যেকোনো সাধারণ সামরিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ মাত্র। পাশাপাশি, সংবেদনশীল সামরিক মূল্যায়ন জনসমক্ষে নিয়ে আসাকে অপরাধ ও দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে তোপ দেগেছেন তিনি। অস্ত্র সংকটের দাবিকেও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে পেন্টাগন।

এদিকে সমস্ত সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর নিজের আস্থার পূর্ণ সমর্থন বজায় রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উলটে তিনি কংগ্রেসের কাছে রেকর্ড ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছেন। সবমিলিয়ে, তীব্র বিতর্ক এবং অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যেও পেন্টাগনের ওপর হেগসেথের নিয়ন্ত্রণ যে আরও পোক্ত হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *