দেশ যখন সুপারহিট, তখন কেন বিদেশ ভ্রমণ ও সোনা কেনার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা? আসল রহস্য ফাঁস করলেন শ্রীধর ভেম্বু!

ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশ হার বা জিডিপি (GDP) এখন ৭.৮ শতাংশের ঊর্ধ্বমুখী গতিতে ছুটছে। কিন্তু এই দারুণ সাফল্যের মাঝেই একটি বড় প্রশ্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছিল—যদি দেশের অর্থনীতি এত দ্রুত গতিতে এগোয়, তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন ভারতীয়দের বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে গিয়ে ধুমধাম করে বিয়ে করা এবং অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন? এই জটিল প্রশ্নের একেবারে সহজ ও স্পষ্ট উত্তর দিয়ে গোটা বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছেন জনপ্রিয় টেক জায়ান্ট ‘জোহো’ (Zoho)-র প্রতিষ্ঠাতা শ্রীধর ভেম্বু।
প্রধানমন্ত্রীর বার্তার নেপথ্যের আসল কারণ
গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের ৭.৮ শতাংশের জোরালো জিডিপি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে আরও বেশি করে ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার ওপর জোর দেন। তিনি দেশবাসীকে স্পষ্টভাবে জানান যে, যতদিন না একান্ত বাধ্যবাধকতা আসছে, ততদিন কেউ যেন বিদেশে ছুটি কাটাতে বা ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করতে না যান এবং অপ্রয়োজনীয় সোনা কেনা থেকে দূরে থাকেন।
এই প্রসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ এক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, অর্থনীতি যখন ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রী কেন আমাদের এই ধরনের বিধিনিষেধ মানতে বলছেন এবং কেনই বা শেয়ার বাজার প্রায় স্থিতিশীল বা নিম্নমুখী রয়েছে? কোনো অর্থনীতিবিদ কি এর সঠিক কারণ বোঝাতে পারবেন?
এই পোস্টের উত্তর দিতে গিয়ে শ্রীধর ভেম্বু ইতিহাস এবং পূর্ব এশীয় অর্থনীতিগুলির অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে আনেন। তিনি জানান, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং পরবর্তীকালে চীনের মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিও একসময় অর্থনৈতিক দ্রুত বিকাশ এবং একই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা (Foreign Exchange) সঞ্চয় করার এই একই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছে।
কেন বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেক্স বাঁচানো জরুরি?
ভেম্বুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভারত বর্তমানে জ্বালানি বা এনার্জি এবং উন্নত প্রযুক্তির জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাঁর যুক্তি, অর্থনীতি যত দ্রুত গতিতে এগোবে, এই ধরনের আমদানি উপকরণের চাহিদা ততটাই বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি পাবে। যদিও দেশের রপ্তানি শিল্প ক্রমশ উন্নত হচ্ছে, কিন্তু সেই রপ্তানি বজায় রাখার জন্যও আজ আমাদের প্রিসিশন মেশিনারি, কাঁচামাল, সিপিইউ, জিপিইউ এবং উন্নত সফটওয়্যারের মতো টেকনোলজিকাল ইনপুট বাইরে থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।
‘বराबरी করতে কয়েক দশক সময় লাগে’
শ্রীধর ভেম্বু সাফ জানিয়েছেন যে, উন্নত প্রযুক্তির ওপর ভারতের এই নির্ভরতা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। জাপান বা চীনের মতো দেশগুলিকেও পশ্চিমের সমকক্ষ হতে কয়েক দশক সময় পার করতে হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের অর্থনীতি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঠিক একই পথে হাঁটছে বর্তমান ভারত সরকারও।
ভারতের অবস্থাকে দ্রুত বর্ধনশীল সংস্থার সঙ্গে তুলনা
ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি র্যাপিডলি গ্রোয়িং বা দ্রুত বর্ধনশীল কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করেছেন ভেম্বু। তাঁর মতে, একটি কোম্পানি যখন খুব দ্রুত বড় হতে শুরু করে, তখন তার সেই সম্প্রসারণের জন্য পুঁজি বাঁচিয়ে রাখা বা ক্যাপিটাল প্রিজার্ভ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। ঠিক তেমনই আমাদের দেশেরও ফরেক্স বা বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় করার প্রয়োজন রয়েছে।
একবার দেশ যখন সমস্ত উন্নত প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে উৎপাদিত রেনুয়েবল এনার্জির মাধ্যমে শক্তির চাহিদা মেটাতে পারবে, তখন আর এই কড়াকড়ির প্রয়োজন হবে না। প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘স্বदेशी’ হওয়ার সেই বার্তার সঙ্গেই ভেম্বুর এই বিশ্লেষণ ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুরক্ষার এক সুদৃঢ় রোডম্যাপ তুলে ধরেছে।