প্রকৃতির কোপ নাকি মানুষের তৈরি ধ্বংসলীলা? বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক জল-বিপর্যয়ের রোমহর্ষক ইতিহাস

মানব ইতিহাসে অন্যতম ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী কিছু দুর্যোগের কারণ হিসেবে সবসময়ই সামনে এসেছে বন্যা। শহর, আস্ত জনপদ, কৃষিজমি এবং পরিকাঠামো ধ্বংস করার পাশাপাশি এই জলপ্রলয় কেড়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ। তবে সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাগুলো সবসময় কেবল প্রাকৃতিক বৃষ্টির কারণে ঘটেনি; এর নেপথ্যে রয়েছে ঘূর্ণিঝড়, বাঁধ ভেঙে যাওয়া, এমনকি যুদ্ধের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে নদীর বাঁধ উড়িয়ে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও। ইতিহাসের পাতা থেকে তেমনই ৭টি ভয়ংকর বন্যার তথ্য সামনে এসেছে, যা আজও শিহরিত করে তোলে।
১. ১৯৩১ সালের চিন বন্যা: (মৃত্যু প্রায় ৪০ লক্ষ) ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক বন্যা হিসেবে গণ্য করা হয় ১৯৩১ সালের চিনের এই বিপর্যয়কে। প্রবল বর্ষণ এবং অতিরিক্ত বরফ গলার ফলে ইয়াংজি, হোয়াংহো এবং হুয়াই নদী উপচে মধ্য চিনের বিশাল এলাকা জলের তলায় চলে যায়। সরাসরি জলে ডোবার চেয়েও বন্যার পরবর্তী সময়ে দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং গৃহহীনতার জেরে মারা যান লাখ লাখ মানুষ।
২. ১৮৮৭ সালের হোয়াংহো নদীর বন্যা: (মৃত্যু প্রায় ২০ লক্ষ) প্রবল বৃষ্টির জেরে চিনের হেনান প্রদেশে হোয়াংহো নদীর বাঁধ ভেঙে এই বিপর্যয় ঘটেছিল। হু হু করে জল ঢুকে পড়ে ঘনবসতিপূর্ণ নিচু এলাকায়, যার জেরে গ্রাম ও কৃষিজমি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
৩. ১৯৩৮ সালের হোয়াংহো নদীর বন্যা: (মৃত্যু প্রায় ৯ লক্ষ) প্রকৃতির কোপ নয়, এই বিপর্যয় ছিল সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট! দ্বিতীয় চিন-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানি সেনাদের অগ্রগতির পথ রুখতে খোদ চিনের জাতীয়তাবাদী বাহিনীই হুয়ায়ুয়ানকৌ-এর কাছে নদীর বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। যার জেরে হেনান, আনহুই এবং জিয়াংসু প্রদেশের বিরাট অংশ জলের নিচে চলে যায়।
৪. ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন: (মৃত্যু প্রায় ৫ লক্ষ) ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছিল গঙ্গা বদ্বীপে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ)। বিশাল জলোচ্ছ্বাসে নিচু দ্বীপ ও উপকূলীয় জনপদ ভেসে যায়, যা উপকূলীয় অঞ্চলের চরম দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
৫. ১৬৪২ সালের কাইফেং বন্যা: (মৃত্যু প্রায় ৩ লক্ষ) সামরিক সংঘাতের ইতিহাসে এটি আরও এক নৃশংস উদাহরণ। কাইফেং শহর অবরোধের সময় শত্রুকে কাবু করতে ইচ্ছাকৃতভাবে হোয়াংহো নদীর বাঁধ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে জলের নিচে তলিয়ে যায় গোটা শহর।
৬. ১৯৭৫ সালের বানকিয়াও বাঁধ বিপর্যয়: (মৃত্যু প্রায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার) টাইফুন নিনারের প্রভাবে চিনের হেনান প্রদেশে হওয়া অস্বাভাবিক বৃষ্টির জেরে বানকিয়াও বাঁধসহ ডজনখানেক বাঁধ ভেঙে পড়ে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভাটির জনপদগুলিকে।
৭. ১৯৭১ সালের রেড রিভার ডেল্টা বন্যা: (মৃত্যু প্রায় ১ লক্ষ) উত্তর ভিয়েতনামের রেড রিভার ডেল্টায় প্রবল মৌসুমি বৃষ্টির জেরে এই মারাত্মক বন্যা হয়েছিল। দুর্বল বন্যা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চরম আবহাওয়ার সঙ্গে দুর্বল পরিকাঠামো এবং অপরিকল্পিত জনবসতি যুক্ত হলেই এ ধরনের বিপর্যয় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। যদিও আধুনিক প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কবার্তা বহু মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে, তবে অতীতের এই ভয়াবহ শিক্ষাগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।