কৈলাস যাত্রার মাঝেই ভয়ঙ্কর হরপা বান! মাত্র ১০ মিনিটের চা বিরতি না থাকলে কী হতো?

কৈলাস মানস সরোবরে যাওয়ার শেষ সুযোগ ছিল সেটাই। একবারের জন্য পবিত্র সেই ধর্মীয় স্থান চাক্ষুস করার ইচ্ছা ছিল প্রবল। কিন্তু তার বদলে একেবারে কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখে এলেন উত্তরপাড়ার বাসিন্দা অঞ্জনা সান্যাল। এখনও তাঁর চোখে-মুখে আতঙ্কের সেই ছাপ স্পষ্ট। তবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরার এই রোমহর্ষক ঘটনার পিছনে রয়েছে মাত্র ১০ মিনিটের এক চা বিরতি। সেই কজির সময়েই ঘুরে যায় ভাগ্য।

কলকাতার একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা অঞ্জনা সান্যাল। উত্তরপাড়ার ব্যানার্জি পাড়া স্ট্রিটের বাসিন্দা তিনি। অঞ্জনাদেবী জানান, ১৭ জনের দল ছিল তাঁদের। গত ২৬ তারিখ কাঠমান্ডু থেকে বাসে করে চিনা ইমিগ্রেশন দফতরের দিকে রওনা দেন তাঁরা। মাঝপথে সামান্য বিরতির জন্য বাস দাঁড়ালে তা ১৭ জনের জীবন বাঁচিয়ে দেয়।

পুরো ঘটনাটি স্মরণ করে অঞ্জনাদেবী বলেন, “২১ অগস্ট রক্সল যাই। সেখান থেকে নেপাল বর্ডার পার হয়ে পীরগঞ্জ এবং কাঠমান্ডু পৌঁছাই। শনিবারে পৌঁছানোর কারণে ভিসা অফিস বন্ধ থাকায় সোমবার পারমিট মেলেনি। মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটায় খবর পাই ভিসা গ্র্যান্টেড হয়েছে। ২৬ তারিখ সকালে সামান্য লাগেজ নিয়ে সাড়ে ছটায় চিনা সীমান্তের খেড়ুঙের উদ্দেশে রওনা দিই। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগে দেখি পরপর ট্যুরিস্ট বাস দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারিনি কী হচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ধোঁয়ার মতো কিছু একটা দেখতে পাই। পরে উল্টোদিক থেকে আসা বাইক আরোহীরা জানান, হরপা বান আসছে। তখনই চালক তৎপরতার সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে নেন।”

কীভাবে ১০ মিনিটের এই বিরতি প্রাণ বাঁচাল? অঞ্জনাদেবীর কথায়, “খেড়ুঙ যাওয়ার পথে ফ্রেশ হওয়ার জন্য বাস দাঁড়িয়েছিল। সেই সময় অনেকেই চা খান। ঠিক দশ মিনিট পর বাস ছাড়ে। ওই বিরতিই আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। আরেকটু এগিয়ে গেলেই আমরা জ্যামে পড়ে যেতাম। তখন আর গাড়ি ঘুরিয়ে ফেরার কোনও রাস্তা থাকত না।”

সামনে থেকে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। অঞ্জনাদেবী বলেন, “চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। ভারাক্রান্ত মনে হচ্ছিল, এত কাছে এসেও কৈলাস দর্শন হলো না। এদিকে ছেলে বারবার ফোনে খবরের আপডেট দিচ্ছিল।”

এই বিপর্যয়ের পিছনে চিনকে দায়ী করে তিনি বলেন, “হিমবাহ ভেঙে পড়ার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় পেয়েছিল নেপাল। চিন যদি আগে থেকেই সতর্ক করত, তাহলে এত মানুষের প্রাণ যেত না।”

উত্তরপাড়ার এই প্রাক্তন শিক্ষিকার বেড়ানোর অভ্যাস দীর্ঘদিনের। কলকাতার তিনটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তবে নেপালের এবারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি জানান, কৈলাসে যেতে না পারায় প্রথমে মনে হয়েছিল কী এমন পাপ করেছিলেন যে দর্শন হলো না। কিন্তু মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরার পর তাঁর ধারণা বদলেছে। বয়সের বাধা পেরিয়ে আগামী দিনে হেলিকপ্টারেই কৈলাসে গিয়ে মানস সরোবরের জল মাথায় তোলার ইচ্ছা এখনও লালন করে চলেছেন তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *