প্রেম নাকি মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ? বারবার ফোনের স্ক্রিন চেক করার এই অদ্ভুত অভ্যাস ধ্বংস করছে না তো আপনার জীবন?

একটা মেসেজের অপেক্ষা। বারবার ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখা—সে অনলাইনে এল কি না, কিংবা শেষ কখন অনলাইন ছিল তা বারবার খতিয়ে দেখা। একটু রিপ্লাই না পেলেই মনে হয় বুঝি বড় কোনো বিপদ হয়েছে! অথচ হঠাৎ একটা ছোট্ট ‘হাই’ বা ‘কী করছ’ মেসেজ দেখেই মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে মন। কাজের মাঝেও তার কথা মাথায় ঘোরা, রাতের পর রাত পুরোনো চ্যাট স্ক্রোল করা কিংবা তাকে নিয়ে মনের মধ্যে ভবিষ্যতের রঙিন গল্প বুনে যাওয়া—এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ঠিক কী বলা হয়?

লিমেরেন্স (Limerence) আসলে কী?

মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী, কাউকে কেন্দ্র করে আকর্ষণ, কল্পনা, প্রত্যাশা এবং চিন্তা যখন চরম মাত্রায় পৌঁছে যায় এবং তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন তাকে ‘লিমেরেন্স’ বলা হয়। কাউকে ভালো লাগলেই যে তা লিমেরেন্স, এমনটা নয়। আসল বিষয় হলো এই অনুভূতির তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং এর ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে কি না।

কখন এই ভালোলাগা অতিরিক্ত হয়ে দাঁড়ায়?

নতুন কাউকে ভালো লাগলে তাঁর কথা মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন সেই মানুষটি শুধু আপনার মনে থাকেন না, বরং আপনার মনের একটা বিরাট অংশ দখল করে নেন। অফিসের কাজ হোক কিংবা পড়তে বসা—দিনের একটা বড় সময় যদি কেবল তার প্রোফাইল চেক করা বা তার আচরণ বিশ্লেষণ করতেই কেটে যায়, তবে একটু থামার সময় এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বারবার ফিরে আসা চিন্তা, আবেগের দ্রুত ওঠানামা এবং তার কাছ থেকে ভালোবাসার স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র আকুলতা দেখা দেয়।

মেসেজের অপেক্ষায় অস্থিরতা কেন?

এর মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে থাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে। “সে কি আমাকে পছন্দ করে?”, “আজ এতক্ষণ কথা বলল কেন?”, কিংবা “রিপ্লাই দিতে এত দেরি হচ্ছে কেন?”—এই প্রশ্নগুলোই আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। মেসেজ এলে মন ভালো হয়, আবার উত্তর না পেলে শুরু হয় চরম অস্থিরতা। অর্থাৎ, নিজের আবেগের রিমোট কন্ট্রোলটা যেন স্বেচ্ছায় অন্য একজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

প্রেম এবং লিমেরেন্সের আসল পার্থক্য:

প্রেম অত্যন্ত তীব্র হতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং বাস্তব বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। সেখানে মানুষটিকে তাঁর ভালো ও মন্দ—উভয় দিক থেকেই মেনে নেওয়ার সুযোগ থাকে। পক্ষান্তরে, লিমেরেন্সে অনিশ্চয়তা এবং অপেক্ষাটাই প্রধান হয়ে ওঠে। মানুষটি কাছে এলে চরম আনন্দ আর দূরে গেলে অস্থিরতা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লিমেরেন্স কোনো মানসিক রোগ নয়। তাই কাউকে নিয়ে অতিরিক্ত ভাবলেই নিজেকে ‘লিমেরেন্ট’ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে নিজের মনকে কয়েকটি প্রশ্ন করা জরুরি—এই চিন্তাগুলো কি আপনার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? তার মেসেজের ওপর কি আপনার মেজাজ পুরোপুরি নির্ভর করছে? উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয় এবং বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে বিষয়টিকে হালকাভাবে না নিয়ে মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া শ্রেয়।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *