গর্ভাবস্থায় এই মারাত্মক ভুল করলেই মর্মান্তিক বিপদ! সামান্য জলের সমস্যা ভেবে অবহেলা করছেন না তো?

হেপাটাইটিস ই সাধারণত একটি সাধারণ ও নিজে থেকেই সেরে যাওয়া সংক্রমণ হিসেবে পরিচিত হলেও, গর্ভাবস্থায় বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। পুনের মাদারহুড হসপিটালের কনসালট্যান্ট অবস্টেট্রিশিয়ান ও গাইনোকলজিস্ট ডা. সুচেতা পার্টে ‘নিউজ নাইন লাইভ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন, কেন গর্ভাবস্থায় জলবাহিত এই সাধারণ সংক্রমণকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে জন্ডিস, বমি ভাব বা গাঢ় রঙের প্রস্রাবের মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা করা মারাত্মক ভুল হতে পারে।

ডা. সুচেতা পার্টে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস ই-কে কোনো সাধারণ ভাইরাল ইনফেকশন হিসেবে দেখা একেবারেই ঠিক নয়। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এই রোগের তীব্রতা এবং জটিলতার ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে যায়, যা সময়মতো চিহ্নিত করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি করে তোলে।

কীভাবে ছড়ায় এই সংক্রমণ?
হেপাটাইটিস ই ভাইরাস (HEV)-এর কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। মূলত মল-মুখের মাধ্যমে (faecal-oral route) এই সংক্রমণ ছড়ায়। সংক্রামিত মলের সংস্পর্শে আসা দূষিত জল পান করার মাধ্যমেই এটি সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত পানীয় জল এবং খাদ্যে পরিচ্ছন্নতার অভাব এর মূল ঝুঁকি। ভারতের মতো দেশে যেখানে নিকাশি ও পানীয় জলের ব্যবস্থা প্রায়ই ভেঙে পড়ে, সেখানে এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে গর্ভবতী মহিলারা এর এক ব্যতিক্রমী ও ঝুঁকিপূর্ণ শিকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, গর্ভবতী মহিলারা, বিশেষ করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে থাকা হবু মায়েরা তীব্র লিভার ফেইলিওর, গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু এবং মারাত্মক পরিণতির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।

লক্ষণগুলো গর্ভাবস্থার সাধারণ সমস্যার মতোই মনে হতে পারে
প্রাথমিক পর্যায়ে হেপাটাইটিস ই-এর কারণে জ্বর, ক্লান্তি, খিদে কমে যাওয়া, বমি ভাব এবং পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্ডিস, গাঢ় রঙের প্রস্রাব বা ফ্যাকাশে মলও দেখা দিতে পারে। যেহেতু গর্ভাবস্থায় বমি ভাব, ক্লান্তি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, তাই এই প্রাথমিক লক্ষণগুলো সহজেই নজর এড়িয়ে যায়।

ডা. সুচেতা পার্টে সতর্ক করে বলেছেন, গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত বমি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, গাঢ় প্রস্রাব বা চোখ-ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে শুধুমাত্র গর্ভাবস্থার সাধারণ পরিবর্তন বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। এই ধরনের লক্ষণ দেখা মাত্রই দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। শুধুমাত্র লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে এই রোগ পুরোপুরি শনাক্ত করা সম্ভব নয়, কারণ এটি অন্যান্য হেপাটাইটিসের মতোই দেখতে হতে পারে। রক্ত পরীক্ষা, লিভারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই রোগ নির্ণয় করা হয়।

কেন তৃতীয় ট্রাইমেস্টার সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের?
ডব্লুএইচও-র মতে, হেপাটাইটিস ই আক্রান্ত গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ‘ফুলমিনেন্ট হেপাটাইটিস’ অর্থাৎ অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তীব্র লিভার ফেইলিওরের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে। বিশেষ করে তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে এই ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করে, যেখানে মৃত্যুর হার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

গর্ভাবস্থায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং হরমোনের পরিবর্তনের কারণেই এই তীব্রতা বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়। এর ফলে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি, আকস্মিক প্রসব বেদনা, কম ওজনে শিশু জন্ম এবং প্রসবোত্তর রক্তপাতের মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (NCDC)-ও একই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

প্রতিরোধের প্রথম শর্ত নিরাপদ জল
এই রোগের নিরাময়ে কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত সহায়ক এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করে লিভার ফেইলিওরের চিকিৎসা করতে হয়।

ডা. সুচেতা পার্টে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, গর্ভবতী মহিলাদের জন্য প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। নিরাপদ পানীয় জল পান করা, হাত পরিষ্কার রাখা, ভালোভাবে রান্না করা খাবার খাওয়া এবং খাবার ও জলের উৎস সম্পর্কে সতর্ক থাকা এই সংক্রমণ এড়ানোর একমাত্র উপায়। বরফ বা অনিরাপদ জল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ফলমূল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুতে হবে।

সবশেষে চিকিৎসকের পরামর্শ, গর্ভাবস্থায় জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা পেটে ব্যথার মতো কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সচেতনতা এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধিই মা ও অনাগত সন্তানকে এই মারাত্মক বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *