কম খরচে AC-তে ভ্রমণ, এবার আসছে আম জনতার ‘বন্দে ভারত’, জানুন বিস্তারিত

দূরপাল্লার সাশ্রয়ী যাত্রার অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে এবার বড়সড় আপডেট নিয়ে আসছে ভারতীয় রেল। সাধারণ মানুষের অত্যন্ত পছন্দের ‘অমৃত ভারত এক্সপ্রেস’-এ (Amrit Bharat Express) খুব শীঘ্রই যুক্ত হতে চলেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা এসি (AC) কোচের বিকল্প। রেল সূত্রে খবর, নতুন প্রযুক্তির ‘অমৃত ভারত ৩.০’ সংস্করণের জন্য ইতিমধ্যেই ১৪টি নতুন রেক বা ট্রেন সেটের অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং চলতি অর্থবর্ষের মধ্যেই সেগুলি পরিষেবায় চলে আসবে বলে জোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে এতদিনকার নন-এসি এবং ইকোনমি ক্লাবের পাশাপাশি অমৃত ভারত ব্র্যান্ডের হাত ধরে ট্রেনটিতে যুক্ত হতে চলেছে প্রিমিয়াম ভ্রমণের এক নতুন অধ্যায়।

সাশ্রয়ী ভাড়ার জনপ্রিয় বাহন,

সাধারণ যাত্রী, শ্রমিক এবং পরিযায়ী জনগোষ্ঠীর দূরপাল্লার যাতায়াতের কথা মাথায় রেখে ২০২৩ সালে কম খরচে আরামদায়ক ভ্রমণের বিকল্প হিসেবে এই অমৃত ভারত এক্সপ্রেস চালু করেছিল রেল। বর্তমানে এই ট্রেনগুলিতে মূলত জেনারেল এবং স্লিপার ক্লাসের কোচ রয়েছে। ট্রেনগুলির দুর্দান্ত গতি এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার কারণে খুব কম সময়েই এটি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের মতো যাত্রীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ভারতীয় রেল নেটওয়ার্কে ৬০টিরও বেশি অমৃত ভারত এক্সপ্রেস নিয়মিত চলাচল করছে। বিশেষ করে স্লিপার ক্লাসের ভাড়া প্রতি ১,০০০ কিলোমিটারে মাত্র প্রায় ৫০০ টাকা হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে।

স্লিপার ক্লাসে উপচে পড়া ভিড়,

অমৃত ভারত এক্সপ্রেসের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা এবং সাফল্যের আসল প্রমাণ মেলে এর স্লিপার কোচগুলির বুকিং দেখলে। রেলওয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বহু অমৃত ভারত ট্রেনের স্লিপার ক্লাসের গড় আসনে যাত্রী বা অকুপেন্সি রেট ১০০ শতাংশেরও বেশি। বিশেষ করে উৎসবের মরশুম বা ছুটির দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে এই ট্রেনগুলি এক প্রকার মুশকিল আসান হিসেবে কাজ করছে।

পুশ-পুল প্রযুক্তিতে দুরন্ত গতি:

অমৃত ভারত এক্সপ্রেসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘পুশ-পুল’ (Push-Pull) টেকনোলজি। এই ট্রেনগুলির দুই প্রান্তেই লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন থাকায় এর গতি বৃদ্ধি ও হ্রাস করা অত্যন্ত সহজ হয়। এর ফলে ট্রেনটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৩০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে সক্ষম। দুই প্রান্তে ইঞ্জিন থাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এবং ব্যস্ততম রুটেও ট্রেন পরিচালনা অনেক সহজ হয়, কারণ স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় গতি তুলতে প্রয়োজনীয় সময় অনেকটাই কমে যায়।

কী কী আধুনিক সুবিধা মিলবে?

যাত্রীদের আরামদায়ক সফরের কথা মাথায় রেখে অমৃত ভারত ট্রেনের অন্দরে একাধিক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • ফোল্ডেবল স্ন্যাক টেবিল, উন্নতমানের বার্থ ও সিট।

  • এলইডি আলো, মোবাইল হোল্ডার এবং ইউএসবি টাইপ-এ ও টাইপ-সি চার্জিং পোর্ট।

  • এয়ার-স্প্রিং সাসপেনশন এবং প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন সিস্টেম (PAPIS)।

  • সম্পূর্ণ সিল করা গ্যাংওয়ে, ভ্যাকুয়াম ইভাকুয়েশন সিস্টেম এবং সেমি-অটোমেটিক কাপলার।

  • প্রতিটি কোচে দুটি ভারতীয় ও দুটি পাশ্চাত্য শৈলীর শৌচাগার, অটোমেটিক সাবান ডিসপেনসার, টয়লেট ইন্ডিকেশন লাইট এবং জরুরি আলোর ব্যবস্থা।

২. য়া পেরিয়ে এবার ‘অমৃত ভারত ৩.০’-এর পালা:

রেলওয়ে সূত্রে খবর, অমৃত ভারতের পরবর্তী সংস্করণগুলি নিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রেটেড কোচ ফ্যাক্টরি (ICF-Chennai) অমৃত ভারত ২.০ সংস্করণের জন্য ৫০টি ট্রেন সেট তৈরির অর্ডার পেয়েছিল, যার মধ্যে ৩২টি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। চলতি বছরে আরও ১৮টি রেক আসার কথা রয়েছে। পাশাপাশি, কাপুরথালা রেল কোচ ফ্যাক্টরিও (RCF Kapurthala) ৫০টি রেক তৈরির কাজ চালাচ্ছে। আর এর মাঝেই এবার নজর দেওয়া হয়েছে সর্বাধুনিক ‘অমৃত ভারত ৩.০’-র ওপর, যেখানে নতুন এসি কোচ যুক্ত করার কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের মতে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ যুক্ত এই নতুন অমৃত ভারত ৩.০ সাধারণ মানুষের কাছে কার্যত ‘বন্দে ভারত’-এর একটি সাশ্রয়ী সংস্করণ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। চেন্নাই ইন্টিগ্রেটেড কোচ ফ্যাক্টরির অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার সুধাংশু মণির মতে, ভারতের ধীরে ধীরে সমস্ত প্রধান ট্রেনেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি জোর দেওয়া উচিত। অন্যদিকে, রেল বিশেষজ্ঞ জি. রঘুরামের অভিমত, দুই প্রান্তে ইঞ্জিন থাকার কারণে উচ্চ ঘনত্বের রুটে এই ট্রেনগুলি অত্যন্ত লাভজনক প্রমাণিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, অমৃত ভারতের এই নতুন রূপ আগামী দিনে রেলযাত্রার মান যে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেবে, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *