রান্নাঘরের বাজেট ছারখার! মাঠের ২০ টাকার পেঁয়াজ বাজারে ৭০ টাকা হওয়ার আসল কারণ কী? আসল রহস্য ফাঁস

মাঠে যখন পেঁয়াজ ওঠে, তখন কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে ছবিটা উল্টো। কিছুদিন আগেও যখন পেঁয়াজ কেনার জন্য কৃষকদের এক টাকা পাওয়ার খবর শিরোনাম হয়েছিল, তখন সাধারণ ক্রেতারা ঠিকই প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩৫ টাকায় কিনেছেন। আজ সেই একই পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ টাকায়। অথচ কৃষকরা এর জন্য পাচ্ছেন মাত্র কুড়ি টাকার কাছাকাছি।

পেঁয়াজের দাম বাড়লেই রান্নাঘরের বাজেট এক ধাক্কায় খারাপ হতে শুরু করে। সাধারণ মানুষের পকেটে সরাসরি টান পড়ার কারণে পেঁয়াজের বাজার সবসময়ই একটা বড় রাজনৈতিক ইস্যু। মনে একটা প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক যে, কৃষকের খেত থেকে যে পেঁয়াজ মাত্র একুশ টাকায় বিক্রি হলো, তা ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই তিন গুণেরও বেশি দাম হয়ে যাচ্ছে কীভাবে?

কৃষক আর ভোক্তার দামের এত ফারাক কেন?
কৃষক সাধারণত খেত থেকে পেঁয়াজ তুলে স্থানীয় বাজার বা কোনো ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। সেখানে তিনি যে দাম পান, সেটাই খামার বা বাজার দর। এরপর পেঁয়াজটাকে পাড়ি দিতে হয় লম্বা পথ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সেটি কেনার পর শুরু হয় বাছাইয়ের কাজ। গুণমান অনুযায়ী পেঁয়াজ আলাদা করে তা পাঠানো হয় বড় পাইকারি বাজারগুলোতে। এরপর হাত বদল হয়ে তা পৌঁছায় সবজি বাজার এবং সবশেষে শহরের খুচরা দোকানদারদের কাছে।

এই পুরো যাত্রায় প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয় পরিবহন খরচ, সংরক্ষণের খরচ, বাছাই করার খরচ, প্যাকিংয়ের খরচ এবং অবশ্যই ব্যবসায়ীদের মুনাফা। ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাকের ভাড়াও বাড়ে। সাথে থাকে টোল ট্যাক্স। পেঁয়াজ এমন একটা পণ্য যা ট্রাকে করে মণের পর মণ বা লক্ষ লক্ষ কেজি হিসেবে পরিবাহিত হয়। এই বিশাল পরিমাণের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে সামান্য কয়েক টাকার পরিবহন খরচও শেষ পর্যন্ত একটা বড় অঙ্কে গিয়ে দাঁড়ায়।

দাম হঠাৎ কেজি প্রতি ৭০ টাকা হওয়ার কারণগুলো কী?
মাঠ থেকে তোলা সব পেঁয়াজ কিন্তু একই মানের হয় না। বাজারে আনার আগে সেগুলো ভালো করে বাছাই করা হয়। ছোট আকারের, নিম্নমানের বা পচা পেঁয়াজগুলো আলাদা করে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে ব্যবসায়ীর খরচ ওঠে বাকি থাকা ভালো পেঁয়াজগুলোর ওপর। সেখান থেকেই কেজির দাম বাড়তে শুরু করে। বড় ও সুন্দর পেঁয়াজের দাম স্বভাবতই বেশি থাকে।

অন্যান্য ফসলের মতো পেঁয়াজও কোনো ক্ষতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা খুব কঠিন। আর্দ্রতা, গরম আবহাওয়া কিংবা অনুপযুক্ত সংরক্ষণের কারণে পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। কোনো পাইকারি বিক্রেতা বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ কেনার পর যদি তার একটা অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে বাকি পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিতে হয়। ব্যবসার ভাষায় একে বলে অপচয়ের ঝুঁকি।

কৃষক এবং ক্রেতার মধ্যে কেবল একজন মধ্যস্বত্বভোগী থাকেন না। এই সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থানীয় ক্রেতা, কমিশন এজেন্ট, বাজারের ব্যবসায়ী, বড় পাইকার, শহরের পাইকার থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত অনেকেই জড়িত থাকেন। প্রত্যেকেই নিজেদের খরচ এবং লাভের হিসাব যোগ করে দাম বাড়িয়ে দেন।

কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় উৎপাদন কম হলে বা অন্য জায়গা থেকে সরবরাহ আসতে দেরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অনেক সময় হাতেগোনা কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর কাছে বাজারে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ মজুত থাকে, যা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে।

খুচরা বিক্রেতার হিসাবটা কেমন?
যিনি আপনাকে ৭০ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, তিনি যে ঠিক ২১ টাকা দরে তা কিনেছেন এমন কোনো কথা নেই। তিনি হয়তো শহরের পাইকারি বাজার থেকে এর চেয়ে অনেক চড়া দামে তা সংগ্রহ করেন।

এর সাথে যোগ হয় দোকানে পেঁয়াজ আনার পরিবহন খরচ, দোকানের ভাড়াও, কর্মচারীর মজুরি, বিদ্যুৎ খরচ, পচা পেঁয়াজের কারণে হওয়া লোকসান এবং দোকানদারের নিজের লাভ। খুচরা বিক্রেতারা অল্প পরিমাণে পণ্য বিক্রি করেন, তাই পাইকারদের তুলনায় তাদের প্রতি কেজির পরিচালনা খরচ কিছুটা বেশি হয়।

দাম কম থাকলে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এবং কমিশন এজেন্ট কোল্ড স্টোরেজে পেঁয়াজ মজুত করে রাখেন। বাজারে যখন সত্যিকারের ঘাটতি তৈরি হয়, তখন আকাশচুম্বী লাভের আশায় সেই পেঁয়াজ বাজারে ছাড়া হয়।

কৃষকরা এত কম দামে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন কেন?
দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকদের একটা বড় অংশ ফসল পাকার সাথে সাথেই তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তী ফসলের জন্য দ্রুত জমি প্রস্তুত করতে হয় এবং চাষাবাদের পেছনে করা ধারদেনা মেটানোর তাগিদও থাকে। সব মিলিয়ে পেঁয়াজের এই চড়া দামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজার ব্যবস্থার নানা ফাঁকফোকর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *