AK-47 অতীত! এবার নিজেদের AK-203 Rifle বানিয়ে ফেলল ভারত, কাঁপছে শত্রুরা!

ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার পথে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মাইলফলক অর্জিত হলো। রাশিয়ার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে উত্তরপ্রদেশের আমেঠীর করওয়া অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে সম্পূর্ণ দেশীয় উপাদানে সফলভাবে তৈরি হলো নতুন প্রজন্মের একে-২০৩ অ্যাসল্ট রাইফেল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য তৈরি এই বিশেষ ও শক্তিশালী রাইফেলের আনুষ্ঠানিক ভারতীয় নাম রাখা হয়েছে ‘শের’। সম্প্রতি আমেঠীর এই রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাতেই অস্ত্রটির অত্যন্ত সফল ফায়ারিং ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে, যা দেশের সামরিক উৎপাদন ক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিল।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর বহুল ব্যবহৃত পুরনো আইএনএসএএস (INSAS) রাইফেলের পরিবর্তে একটি আধুনিক এবং অধিক নির্ভরযোগ্য অ্যাসল্ট রাইফেল অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল কেন্দ্রের। সেই লক্ষ্যেই রাশিয়ার সঙ্গে একটি কৌশলগত যৌথ চুক্তির মাধ্যমে একে-২০৩ রাইফেল তৈরির এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। প্রারম্ভিক পর্যায়ে এই অস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরনির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠেছে ভারত। বর্তমানে এই রাইফেলের ১০০ শতাংশ উপাদানই দেশীয় প্রযুক্তিতে এবং দেশীয় সরবরাহকারীদের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে, যা আত্মনির্ভর ভারতের মুকুটে এক উজ্জ্বল রত্ন।
করওয়ার ‘ইন্দো-রাশিয়ান রাইফেলস প্রাইভেট লিমিটেড’ (IRRPL)-এর প্ল্যান্টেই মূলত এই একে-২০৩ রাইফেলগুলির বাণিজ্যিক উৎপাদন চলছে। ২০১৯ সালে ভারত ও রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর এই যৌথ উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, যেখানে ভারতীয় সংস্থার পাশাপাশি রাশিয়ার স্বনামধন্য ক্লাশনিকভ কনসার্ন এবং রোসোবোলোনএক্সপোর্ট সংস্থাও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। IRRPL-এর প্রধান তথা ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেজর জেনারেল এস কে শর্মার মতে, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কেবল বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে ভারতে জোড়াতালি দিয়ে কোনো অস্ত্র তৈরি করা ছিল না। বরং রাইফেলের প্রতিটি ক্ষুদ্রাংশ ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ দেশীয় উপায়ে প্রস্তুত করার একটি সুদূরপ্রসারী রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছিল।
একটি নিখুঁত একে-২০৩ রাইফেলে প্রায় ৫০টি প্রধান যন্ত্রাংশ, প্রায় ১৮০টি উপ-যন্ত্রাংশ এবং প্রায় ১২০টি জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া জড়িত থাকে। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই যথাযথ সামরিক মান বা মিলিটারি স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার জন্য কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রাথমিক প্রক্রিয়া ২০২৩-২৪ সালের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ব্যারেল, বোল্ট, বিভিন্ন বাহ্যিক বডি পার্টস, বিশেষ কোটিং এবং ফায়ার-কন্ট্রোল উপাদান তৈরির জন্য দেশের অভিজ্ঞ অভ্যন্তরীণ সরবরাহকারীদের প্রস্তুত করতেই মূলত সময় লেগেছিল। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এই রাইফেলে দেশীয় উপাদানের মাত্রা প্রায় ৫০ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা উন্নীত হয়ে শতভাগে এসে ঠেকেছে।
এই প্রকল্পের বিশালতাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, IRRPL সংস্থাকে ভারতীয় সেনার জন্য মোট ৬,০১,৪২৭টি একে-২০৩ রাইফেল তৈরি করে সরবরাহ করতে হবে। পুরো প্রকল্পটির আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ৫,২০০ কোটি টাকা। প্রথমে এই উৎপাদন কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ২০৩২ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ধার্য করা হলেও, সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি দেখে সেই সময়সীমা এগিয়ে এনে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে করওয়া কারখানাকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০টি করে আধুনিক রাইফেল উৎপাদন করতে হবে।
সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের বহুচর্চিত চাহিদা পূরণ করতে চলেছে এই আধুনিক অস্ত্র। বিগত দিনে সেনাদের ব্যবহারের সময় পুরনো আইএনএসএএস রাইফেল নিয়ে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ, বিশেষ করে তীব্র ঠান্ডা আবহাওয়া এবং ম্যাগাজিনের কার্যকারিতা নিয়ে নানা অভিযোগ ও অসন্তোষের কথা সামনে এসেছিল। সেই সমস্ত ত্রুটি দূর করে একে-২০৩ কে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্যাস-চালিত অ্যাসল্ট রাইফেল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ৭.৬২x৩৯ মিমি কার্তুজ ব্যবহারকারী এই অস্ত্রটিতে ভাঁজ করা যায় এমন স্টক এবং যেকোনো ধরনের আধুনিক অপটিক্যাল বা নাইট-ভিশন সরঞ্জাম সহজে সংযোজন করার জন্য উন্নত রেল ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে সেনাবাহিনীতে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে এই দেশীয় ‘শের’ রাইফেলকে আরও একটি অত্যন্ত কঠোর পরীক্ষার ধাপ পার করতে হবে। আগামী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে বেশ কয়েকটি ‘শের’ রাইফেল ভারতীয় সেনার অভিজ্ঞ জওয়ানদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং চরম আবহাওয়ায় এই অস্ত্রগুলির নিখুঁত কার্যকারিতা যাচাই করে দেখা হবে সেনার ফিল্ড ট্রায়াল পর্বে। সেই পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলেই পরবর্তীতে ব্যাপক পরিমাণে উৎপাদনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সবমিলিয়ে, রুশ নকশার বুনিয়াদ থেকে শুরু করে একশো শতাংশ ভারতীয় পরিকাঠামোয় তৈরি এবং পরীক্ষিত এই একে-২০৩ ‘শের’ রাইফেল দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে চলেছে।