বাংলায় ৩,৪০০ কোটির মেগা বিনিয়োগ! হাওড়া থেকে রায়চক—প্রতিরক্ষা ও শিপবিল্ডিংয়ে বিপ্লব আনতে চলেছেন রাজনাথ সিং?

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগের বার্তা দিল কেন্দ্র। হাওড়ার টিম্বার পন্ড শিপবিল্ডিং ফেসিলিটি এবং দামোদর শিপবিল্ডিং ফেসিলিটির সূচনা ও ভূমিপূজার পাশাপাশি রায়চক শিপইয়ার্ডের ভূমিপূজার সূচনা হলো প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের হাত ধরে। একইসঙ্গে রাজ্যে প্রায় ৩,৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভূমিপূজা ও শিলান্যাস করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজনাথ সিং বলেন, এই প্রকল্পগুলি ভারতের ভবিষ্যৎ সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করবে। পাঁচটি প্রকল্পই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, উন্নত প্রযুক্তি এবং শিপবিল্ডিং শিল্পের সম্ভাবনা।

YIL-এর উন্নত উৎপাদন পরিকাঠামোয় জোর
রাজনাথ সিং জানান, যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেড (YIL) বর্তমানে অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং-এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে আসছে। ইশাপুরের মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরিতে দুটি নতুন প্রকল্পেরও সূচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপকরণের জোগান শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হবে।

প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই YIL প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বলেও দাবি করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। প্রথাগত উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নেও সংস্থা বড় বিনিয়োগ করছে। রাজনাথ সিংয়ের দাবি, গত জানুয়ারি থেকে ইশাপুরে YIL-এর তরফে ১,৩০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে পুরনো পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং উন্নত উৎপাদন পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে।

‘ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বকে সক্ষমতা দেখিয়েছে’
দেশীয় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন রাজনাথ সিং। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভারতের দেশীয় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। আগামী দিনে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের অংশীদাররা একসঙ্গে কাজ করবে বলেও জানান তিনি। দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কোনো খামতি রাখা হবে না বলে বার্তা দেন তিনি।

শিপবিল্ডিংয়ে ‘ক্যাপাসসিটি প্যারাডক্স’-এর প্রসঙ্গ
অনুষ্ঠানে শিপবিল্ডিং শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন রাজনাথ সিং। তাঁর কথায়, ভারত যখন সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে চলেছে, তখন শিপবিল্ডিং ক্ষেত্রে সক্ষমতার বৈপরীত্যের বিষয়টি বোঝা জরুরি। বিশ্বজুড়ে জাহাজের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে বলে জানান তিনি। বাণিজ্যিক কার্গো ভেসেল, অয়েল ট্যাঙ্কার থেকে শুরু করে ফিশিং ভেসেল—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী।

কিন্তু অন্যদিকে, আমেরিকা ও ইউরোপের মতো ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাতা দেশগুলির পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। শ্রমনির্ভর শিপবিল্ডিংয়ের খরচ বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে বহু উন্নত দেশ এই ক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে আসছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

‘ভারত বিশ্বের পরবর্তী বড় শিপবিল্ডিং হাব হবে’
এই পরিস্থিতিকে ভারতের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেন রাজনাথ সিং। তাঁর মতে, ভারতের কাছে একদিকে রয়েছে বিশাল দক্ষ জনবল, অন্যদিকে রয়েছে শক্তিশালী স্টিল ইন্ডাস্ট্রি এবং বড় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ভিত্তি। রাজনাথ সিং বলেন, ভারত যদি শিপবিল্ডিংয়ের উৎপাদন সক্ষমতাকে আধুনিক করে তোলে এবং আন্তর্জাতিক মানের গুণমান বজায় রেখে কাজ করতে পারে, তাহলে বিশ্বের পরবর্তী বড় শিপবিল্ডিং হাব হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনা ভারতের রয়েছে।

বাংলায় শিল্প পুনর্জাগরণের বার্তা
রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে বাংলার শিল্প সম্ভাবনার প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, ভারতের শিল্প বিপ্লবের ইতিহাসে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং এবার রাজ্য নতুন করে শিল্প পুনর্জাগরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, বাংলায় শুরু হতে চলা প্রকল্পগুলি শুধু প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাড়াবে না, এর ফলে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও এই প্রকল্পগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পগুলির সূচনাকে দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন এবং শিপবিল্ডিং শিল্পে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে তুলে ধরেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাঁর বার্তা, বাংলায় বিনিয়োগ শুধু রাজ্যের জন্য নয়, আগামী দিনের আত্মনির্ভর ভারতের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *