ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় চিনের বিশাল বাঁধ নির্মাণ, ভারতের জন্য কেন বাড়াচ্ছে চিন্তা?

চিনের তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর নির্মীয়মাণ বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ভূকৌশলবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানি। ভারতে প্রবেশ করার পর যে নদী ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত, তার ওপরেই এই মেগা প্রকল্প তৈরি করছে বেজিং। চেলানির সতর্কবার্তা, অপরিকল্পিত এই বাঁধ নির্মাণের ফলে হিমালয় অঞ্চলে চরম ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে এবং এর জেরে লক্ষ লক্ষ মানুষের নিরাপত্তা সরাসরি সংকটের মুখে পড়তে পারে।
কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ও চিনা গবেষণার তথ্য এক্স হ্যান্ডেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রকল্প নিয়ে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের আরও জোরালো ও সক্রিয় ভূমিকা দাবি করেছেন চেলানি। তাঁর মতে, অবিলম্বে চিনের কাছে এই সংক্রান্ত সমস্ত বিস্তারিত তথ্য চাওয়া উচিত ভারতের। একই সঙ্গে বাঁধ নির্মাণস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে স্বাধীনভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার দাবিও তুলেছেন তিনি।
সম্প্রতি চিনের সরকারি ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের উল্লেখ করে তিনি জানান, চিনা ভূতত্ত্ববিদরাই স্বীকার করেছেন যে প্রস্তাবিত এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফল্ট বা চ্যুতির অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত এবং এখানকার মাটির গঠনও বেশ আলগা। গবেষকদের আশঙ্কা, সামান্য ভূমিকম্প বা ফল্টে সামান্য সক্রিয়তা দেখা দিলেই জলাধারের ঢাল ভেঙে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।
থ্রি গর্জেস ড্যামের থেকেও তিন গুণ বড় প্রকল্প ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর এই প্রস্তাবিত প্রকল্পটিকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন এক আকার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। চেলানির দাবি, এটি চিনের বিখ্যাত থ্রি গর্জেস ড্যামের প্রায় তিন গুণ বড় হতে পারে। হিমালয় অঞ্চল এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, যেখানে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের তীব্র সংঘর্ষ ঘটে। অতীতেও এই অঞ্চলে একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। ফলে এই ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে এমন বিশাল আকারের জলাধার তৈরি হলে তার প্রভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তিব্বতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই নদী অরুণাচল প্রদেশ হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে এবং অসমের পর বাংলাদেশে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে নদীটির উজানে চিনের এই অবস্থানের কারণে জলপ্রবাহের ওপর তাদের একপাক্ষিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, বাঁধের কাঠামোগত ক্ষতি, ভূমিধস বা হঠাৎ অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদ মারাত্মকভাবে প্লাবিত হতে পারে। এই কারণেই একে সম্ভাব্য ‘ওয়াটার বম্ব’ হিসেবে অভিহিত করে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।