কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিতে চাকরি পাওয়া মুশকিল, নীতি আয়োগের রিপোর্টে চাঞ্চল্য

দেশে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা শেষ করে গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক হয়ে বের হচ্ছেন। পকেটে রয়েছে লোভনীয় ডিগ্রি, কিন্তু কপালে জুটছে না কোনো স্থায়ী চাকরি। লাখ লাখ বেকারের এই ভিড় দেখে প্রশ্ন জাগে, তবে কি দেশের চাকরির বাজারে কর্মসংস্থানের চরম আকাল চলছে? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নীতি আয়োগ সম্প্রতি যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তা এককথায় চোখ খুলে দেওয়ার মতো। নীতি আয়োগের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, সমস্যাটি ঠিক যতটা না কর্মসংস্থানের অভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বেশি গভীর। এটি মূলত আমাদের প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক স্কিল বা দক্ষতা এবং বর্তমান লেবার মার্কেটের চাহিদার মধ্যে এক বিশাল বিশাল পরিমাণের ফারাক বা গ্যাপ।
নীতি আয়োগের ‘রিইমাজিনিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত ২০৪৭’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটিতে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, ভারতে মাত্র ৮.২৫ শতাংশ স্নাতক পড়ুয়া যে নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, পরবর্তীকালে সেই বিষয় বা জ্ঞান তাদের প্রফেশনাল চাকরিতে কাজে লাগাতে পারছেন। অর্থাৎ, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সঙ্গে চাকরির বাজারের রিয়েল-ওয়ার্ল্ড রোলের কোনো মিল বা ম্যাচ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে বছরের পর বছর পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করার পরেও তরুণ প্রজন্ম যখন নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো পেশাদার সুযোগ পান না, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে যায়।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিতারামনও এই একই উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেছেন। গত ১৭ আগস্ট এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে এই ধরনের শিক্ষিত বেকারদের নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সংকটের মূল শিকড় লুকিয়ে রয়েছে পড়ুয়ারা যখন কলেজে ভর্তি হন, সেই কোর্স বা বিষয় নির্বাচনের সময় থেকেই। অর্থমন্ত্রীর মতে, আমরা যে সমস্ত গতানুগতিক কোর্সে ভর্তি হই এবং ডিগ্রি পকেটে করে কলেজ চত্বর ছাড়ি, সেগুলির অধিকাংশই আদতে শিক্ষার্থীদের কর্পোরেট বা প্রফেশনাল জগতের যোগ্য করে তোলে না। অনেক ক্ষেত্রে এই পাঠ্যক্রমগুলি তরুণদের একজন আত্মনির্ভর উদ্যোগপতি বা সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তি শিক্ষা পরিকাঠামোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবই আজকের এই করুণ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ক্লাসরুমের চার দেওয়ালের মধ্যে যা পড়ানো হচ্ছে এবং লেবার মার্কেট বা শিল্পমহল যা চাইছে, তার মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। ফলে প্রথাগত ডিগ্রি, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট হাতে থাকা সত্ত্বেও বহু তরুণ-তরুণী বেকার বসে থাকছেন। এর পেছনে রয়েছে চিরাচরিত ডিগ্রি অর্জনের অন্ধ দৌড়। প্রতিবছর ভারতে প্রায় ৩.৪ কোটি ছাত্রছাত্রী গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে নাম লেখান। যার মধ্যে শুধুমাত্র কলা বিভাগ বা বিএ (BA) কোর্সে ভর্তি হন ১.১৩ কোটি পড়ুয়া। বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ মিলিয়ে মোট দুই কোটিরও বেশি তরুণ স্নাতক হন। কিন্তু এই প্রথাগত ডিগ্রিগুলির সঙ্গে চাকরির বাজারের প্রত্যক্ষ কোনো যোগ সংযোগ নেই।
অনেকেই এই ডিগ্রিগুলির পেছনে ছোটেন শুধুমাত্র একটি কারণে—তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে যেকোনো উপায়ে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় বসার ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করা। নীতি আয়োগের রিপোর্টে সরাসরি বলা হয়েছে যে, সাধারণ ডিগ্রিগুলি খুব কম ক্ষেত্রেই এন্ট্রি-লেভেল কর্পোরেট বা প্রাইভেট চাকরির সুযোগ তৈরি করতে পারে। বর্তমান যুগে একটি সাধারণ ডিগ্রির পাশাপাশি ট্যালি (Tally) বা মাইক্রোসফট অফিসের (MS Office) মতো টেকনিক্যাল স্কিল বা বিশেষ কর্মক্ষেত্রভিত্তিক দক্ষতার অত্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা সেই চাহিদা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।