কপিরাইট মামলা এড়াতে অভিনব ফন্দি! লক্ষ লক্ষ ফিজিক্যাল বই কিনে ডিজিটাইজ করছে এআই সংস্থাগুলি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) মডেল তৈরির ক্ষেত্রে এতদিন ইন্টারনেটের বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ডেটা ও অনলাইন কনটেন্টই ছিল মূল ভরসা। কিন্তু কপিরাইট সংক্রান্ত আইনি জটিলতা এবং তথ্যের গুণমান বজায় রাখতে এবার বড় বড় এআই সংস্থাগুলির নজর ঘুরছে ফিজিক্যাল বইয়ের দিকে। বিশেষ করে পুরনো, দুর্লভ এবং নির্দিষ্ট বিষয়ের বই কিনে সেগুলি স্ক্যান করে এআই মডেলের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করার প্রবণতা বিশ্বজুড়ে মারাত্মকভাবে বেড়ে চলেছে।

কেন ফিজিক্যাল বইয়ের দিকে ঝুঁকছে এআই সংস্থাগুলি?

মূলত দুটি প্রধান কারণে এই পথ বেছে নিয়েছে টেক সংস্থাগুলি। প্রথমত, কপিরাইট সংক্রান্ত আইনি ঝুঁকি। এতদিন অনলাইন বইয়ের আর্কাইভ বা ইন্টারনেটের বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এআই মডেলকে ট্রেনিং দেওয়া হতো। এর ফলে লেখক, শিল্পী, ফটোগ্রাফার এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দায়ের করা কপিরাইট সংক্রান্ত একাধিক আইনি মামলায় জড়িয়ে পড়েছে অনেক শীর্ষস্থানীয় এআই সংস্থা।

অন্যদিকে, আইন মেনে একটি ফিজিক্যাল বই কিনলে সেটির মালিকানা ক্রেতার হাতে চলে আসে। প্রচলিত ‘ফার্স্ট-সেল ডকট্রিন’ (First-Sale Doctrine) অনুযায়ী, আইনসম্মতভাবে কেনা বইয়ের নির্দিষ্ট কপির ওপর ক্রেতার পূর্ণ মালিকানাগত অধিকার থাকে। ফলে সেই বই নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ফাইলে রূপান্তর করা আইনসম্মত ‘ট্রান্সফরমেটিভ ফেয়ার ইউজ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়েই সংস্থাগুলি বই কিনে তা স্ক্যান করে বিশাল ডেটাসেটে পরিণত করছে। যদিও সমালোচকদের বক্তব্য, এভাবে বই ডিজিটাইজ করা হলেও লেখক বা সৃষ্টিকর্তারা এর জন্য কোনো বাড়তি পারিশ্রমিক বা রয়্যালটি পাচ্ছেন না।

পুরনো বইয়ের গুরুত্ব কোথায়?

শুধু আইনি জটিলতা এড়ানোই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুণগত মান বাড়াতেও ফিজিক্যাল বইয়ের বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেটের একটি বিরাট অংশ জুড়েই রয়েছে এআই-জেনারেটেড বা কৃত্রিম উপায়ে তৈরি কনটেন্ট। নতুন কোনো এআই মডেলকে যদি সেই কৃত্রিম কনটেন্ট দিয়েই বারবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে তার বুদ্ধিমত্তা ও যুক্তির ক্ষমতা আশানুরূপ উন্নত হয় না।

এর বিপরীতে, মানুষের লেখা এবং নিখুঁতভাবে সম্পাদিত পুরনো বইগুলিতে থাকে দীর্ঘ লেখার ধারাবাহিকতা, গভীর যুক্তি, গল্প বলার সঠিক কাঠামো এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার উদাহরণ। বিশেষ করে ২০২২ সালের আগের প্রকাশিত বইগুলি এআই মডেলের ‘রিজনিং’ বা যুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।

কতটা ব্যাপক এই প্রক্রিয়া?

ফিজিক্যাল বই ধ্বংস করে স্ক্যান করার এই প্রবণতা ঠিক কতটা ব্যাপক, তার সঠিক হিসাব এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সম্প্রতি অ্যানথ্রপিক (Anthropic)-এর বিরুদ্ধে চলা একটি মামলার আদালতের নথি থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের কিছুটা ইঙ্গিত মিলেছে। ওই নথিতে দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসের একটি ভেন্ডর চুক্তির আওতায় সংস্থাটি প্রায় ৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ বই স্ক্যান করার পরিকল্পনা করেছিল। এমনকি অভ্যন্তরীণ নথিতে একসময় বিশ্বের সমস্ত বই কিনে তা ধ্বংস করে স্ক্যান করার মতো চরম পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার কথাও সামনে এসেছে, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *