গাছেদের বিবর্তনের অবাক করা কৌশল: কীভাবে ‘একলা চলো’ নীতিতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে বিদেশি আগাছা?

ভারতের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ‘জৈব-আগ্রাসন’ (biological invasion) বা আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রজাতি এক বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ল্যান্টানা কিংবা বাইডেনস পিলোসার মতো আগাছারা কীভাবে স্থানীয় তৃণভূমি ও বনাঞ্চলকে আমূল বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় বড় তথ্য উঠে এসেছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc)-এর বিজ্ঞানীদের হাতে।
কেন আগ্রাসী হয়ে উঠছে এই উদ্ভিদরা? সাধারণত সপুষ্পক উদ্ভিদের বীজ উৎপাদনের জন্য একই প্রজাতির অন্য উদ্ভিদের পরাগরেণুর প্রয়োজন হয়। কিন্তু সিইএস (CES)-এর গবেষকদের এই নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু উদ্ভিদ খুব দ্রুত নিজেদের প্রজনন কৌশল বদলে ফেলতে সক্ষম। এই উদ্ভিদগুলো সঙ্গী ছাড়াই ‘স্ব-নিষেক’ বা সেলফ-ফার্টিলাইসেশন প্রক্রিয়ায় বংশবৃদ্ধি করতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটিই তাদের সফল আগ্রাসী হয়ে ওঠার অন্যতম প্রধান কারণ।
বিস্ময়কর বিবর্তন গবেষণায় ‘এজেরাটাম কোনিজোইডিস’ ও ‘বাইডেনস পিলোসা’—এই দুটি অত্যন্ত আগ্রাসী উদ্ভিদের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, মেক্সিকোর আদি আবাসস্থলে প্রজাতিগুলো মূলত স্ব-নিষেকে অক্ষম ছিল। কিন্তু ভারতে আসার পর পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এদের মধ্যে এককভাবে প্রজনন করার ক্ষমতা বিবর্তিত হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন কোনো এলাকায় পৌঁছানোর পর প্রজননের জন্য সঙ্গীর অপেক্ষায় না থেকে এরা দ্রুত নিজেদের বংশ বিস্তার করতে শুরু করে, যা তাদের নতুন পরিবেশে আধিপত্য বিস্তার করতে সাহায্য করে।
নির্মূল করা কেন চ্যালেঞ্জিং? অধ্যাপক সাস্কিয়া ভ্যান নুহুইস জানিয়েছেন, স্ব-নিষেকক্ষম এই আগ্রাসী উদ্ভিদগুলোকে একবার কোনো এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হতে দিলে, সেগুলোকে নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ, কোনো এলাকায় হাজার হাজার উদ্ভিদ ধ্বংস করার পরও যদি হাতেগোনা কয়েকটি বেঁচে থাকে, তবে তারা নিজেরাই প্রজনন চালিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঘটাতে পারে।
ভারতের জন্য সতর্কবার্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখনও আগ্রাসী প্রজাতি প্রতিরোধের জন্য শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবের সম্মুখীন। অস্ট্রেলিয়া বা অন্যান্য দেশের মতো ভারতেও কোনো নতুন উদ্ভিদের ঝুঁকি মূল্যায়নের সময় তার প্রজনন কৌশলকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমাগত পরিবেশগত ব্যাঘাত (যেমন রাস্তা নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস) এই আগ্রাসী উদ্ভিদদের জন্য নতুন ‘বাস্তুতান্ত্রিক শূন্যতা’ তৈরি করে দিচ্ছে, যা তাদের বিস্তারকে আরও সহজ করছে।
ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে আগাছা-জনিত ঝুঁকি নিরূপণ কর্মসূচিতে এই প্রজননগত নমনীয়তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।