স্বাধীনতার ইতিহাসের সেই দীক্ষাগুরু! জানেন কৈলাস বোস লেনের বালতি হাতে জল তোলা এই বৃদ্ধ কে ছিলেন?

আজকের ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে চারপাশের উন্নতি, প্রযুক্তি এবং আধুনিক জীবনযাত্রার দিকে তাকালে মনে হতেই পারে যে আমরা এক সম্পূর্ণ নতুন যুগে বাস করছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘আজাদী কা অমৃত মহোৎসব’ এবং দেশজুড়ে চলা ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে আজকের তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি প্রযুক্তির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু এই আধুনিকতার চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে যায় সেই সমস্ত মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস, যাঁদের রক্তে এবং ঘামে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা। আজ ১৭ আগস্ট, স্মরণ করার দিন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অন্যতম অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাসকে।

কে ছিলেন এই পুলিন বিহারী দাস? কালের নিয়মে কলকাতার কৈলাস বোস স্ট্রিটের একটি সাধারণ বাড়িতে বছর ষাট-পঁয়ষট্রি বয়সের এক বৃদ্ধকে রাস্তার কল থেকে লোহার বালতি হাতে জল তুলতে দেখা যেত। পথচলতি মানুষ অনেক সময় তাঁর হাত থেকে বালতিটি নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করা এই মানুষটির দিকে তাকিয়ে কেউ হয়তো বুঝতেও পারতেন না যে তিনি একসময়ে ব্রিটিশ প্রশাসনের ঘুম কেড়ে নেওয়া এক কিংবদন্তি বিপ্লবী। ১৯৪৯ সালের আজকের দিনেই এই মহান বিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তৎকালীন পরাধীন ভারতে যখন বিক্ষিপ্ত আন্দোলন আর হতাশার মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন পুলিন বিহারী দাস বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল আবেগের বশে বা বিচ্ছিন্নভাবে খুন-খারাবি করে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত যুবশক্তি, শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলা এবং সঠিক শিক্ষা। এই ভাবনা থেকেই তিনি ঢাকায় গড়ে তোলেন ‘অনুশীলন সমিতি’। পরবর্তীকালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস থেকে শুরু করে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো দূরদর্শী নেতারাও তাঁর সাংগঠনিক ক্ষমতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। প্রখ্যাত আইরিশ গবেষক জে. সি. জেমস বা মিস্টার এলমার্স্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানিয়েছিলেন যে, পুলিনবাবুর মতো দক্ষ সংগঠক সমগ্র ভারতে সত্যিই দুর্লভ।

শৃঙ্খলাই ছিল যার প্রধান অস্ত্র প্রতিদিন ঠিক বিকেল চারটায় বঙ্গীয় ব্যায়াম সমিতির প্রবেশদ্বার খুলে তরুণ প্রজন্মকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে শক্তিশালী করে তোলার প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি। তাঁর কাছে বিপ্লব কোনো সাময়িক উত্তেজনা ছিল না, বরং তা ছিল এক গভীর আত্মবিশ্লেষণ ও নিষ্ঠার সাধনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, যথাযথ নিয়ম শৃঙ্খলা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই কেবল দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা সম্ভব।

আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন আধুনিকতার মোহে অনেক ক্ষেত্রেই প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে এড়িয়ে চলতে চায়, তখন পুলিন বিহারী দাসের মতো বিপ্লবীদের জীবনদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অতীতের ভিত শক্ত না হলে ভবিষ্যৎ কখনো মজবুত হতে পারে না। সময়ের স্রোতে হয়তো অনেক নামই ফিকে হয়ে আসে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁদের অবদান চিরজাগরূক হয়ে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *