তলিয়ে গেল রাস্তা, ঘরে ঢুকছে নোনা জল! নিম্নচাপ ও কোটালের জাঁতাকলে নাজেহাল দক্ষিণ ২৪ পরগনা

নিম্নচাপের অবিরাম বৃষ্টি এবং অমাবস্যার কোটালের জোড়া ফলায় কার্যত বিপর্যস্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা। বঙ্গোপসাগরের উপর তৈরি হওয়া গভীর নিম্নচাপের জেরে একদিকে যেমন একটানা বৃষ্টি চলছে, তেমনই অন্যদিকে সমুদ্রের রূপ ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। ফলে উপকূলবর্তী জেলার বিস্তীর্ণ অংশ এখন জলমগ্ন। বারুইপুর থেকে শুরু করে সুন্দরবন, ক্যানিং কিংবা কাকদ্বীপ—সর্বত্রই একই করুণ ছবি ধরা পড়েছে।

টানা বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকাগুলির পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। বহু জায়গায় হাঁটু সমান জল জমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ঘর থেকে বের হওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির জলের সঙ্গে নিকাশি নালার নোংরা জল মিশে একাকার হয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে ভয়াবহ রোগ সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ছে। বারুইপুর পুরসভার একাধিক ওয়ার্ডে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যাওয়ার এই পুরনো সমস্যা এবার আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষার আগে ঠিকমতো নিকাশি নালা পরিষ্কার না করায় এবং পর্যাপ্ত পাম্পের অভাবে জল সরতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এর ফলে পানীয় জলের কলের আশপাশও জলমগ্ন হয়ে পড়েছে, যা বিশুদ্ধ জল সংগ্রহের কাজটিকেও কঠিন করে তুলেছে।

শহরাঞ্চলের পাশাপাশি এই দুর্যোগ বড় চিন্তা বাড়িয়েছে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকাতেও। বৃষ্টির জলের প্রবল চাপ এবং নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটির নদীবাঁধগুলির বিভিন্ন অংশে মারাত্মক ক্ষয় ও ধস দেখা দিয়েছে। কোটালের প্রভাবে নদীর জলস্তর আরও বাড়লে বাঁধ ভেঙে নোনা জল লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে প্লাবিত হতে পারে শত শত গ্রাম, কৃষিজমি এবং ঘরবাড়ি। এই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীবাঁধগুলির ওপর বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত মেরামতির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিকূল আবহাওয়ার জেরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। উপকূলবর্তী এলাকায় মাইকিং করে লাগাতার সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। সাগরদ্বীপে প্রায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, আর ক্যানিং ও কাকদ্বীপেও হয়েছে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি। মাটি ইতিমধ্যেই জল ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় নতুন করে বৃষ্টি হলেই জমা জলের পরিমাণ আরও বাড়ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় পাম্প চালিয়ে জল নিষ্কাশনের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপন্ন পরিবারগুলির হাতে ত্রিপল তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক অভিষেক তিওয়ারি জানিয়েছেন যে, জলমগ্ন এলাকাগুলি থেকে দ্রুত জল সরানোর পাশাপাশি নদীবাঁধগুলির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে এবং ব্লক প্রশাসনকে সবরকম প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতত আকাশের মুখ ভার থাকায় এবং দুর্যোগের মেঘ না কাটায় চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন জেলার সাধারণ মানুষ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *