রাম মন্দির ট্রাস্টের সিইও হতে হুড়োহুড়ি! ৫০০০-এর বেশি আবেদন দেখে চোখ কপালে তুলবে সবার

রাম মন্দির ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদের জন্য যে ধরনের তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা গেছে, তা অতীতে অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে সচরাচর দেখা যায়নি। এই পদের বিপরীতে জমা পড়া মোট ৫,৫৮৫টি আবেদনের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে যাঁদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় রাখা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস ও আইপিএস কর্মকর্তা, প্রাক্তন সামরিক কর্মী, বড় বড় কর্পোরেট পেশাজীবী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এরপর দীর্ঘ বাছাই পর্ব পেরিয়ে গত ১১ ও ১২ আগস্ট অযোধ্যায় ১৬ জন শীর্ষস্থানীয় প্রার্থী সরাসরি সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। প্রশ্ন উঠেছে, কেন দেশের এত উচ্চপদস্থ আমলা, পুলিশ কর্তা এবং প্রাক্তন সেনাকর্তারা এই পদের প্রতি এতখানি আকৃষ্ট হয়েছেন?

রাম মন্দির কি আর কেবল সাধারণ উপাসনালয়?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অযোধ্যায় ঘটে চলা যুগান্তকারী পরিবর্তনের মধ্যে। লখনউয়ের শনি মন্দির ট্রাস্টের প্রধান তথা এক অবসরপ্রাপ্ত আমলা হরি নারায়ণ মিশ্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাম মন্দির এখন আর কেবল আচার-অনুষ্ঠান, দানবাক্স আর সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বিরাট ও অত্যন্ত জটিল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। যেখানে একই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী, একাধিক নিরাপত্তা সংস্থা, সরকারি বিভাগ, বিশাল নির্মাণ প্রকল্প, হাজার হাজার কর্মী, বিক্রেতা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং দেশবাসীর নজরদারি সামলাতে হয়। ফলে এই পদের দায়িত্ব কোনো গতানুগতিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বরং একটি বৃহৎ সরকারি বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সমতুল্য।

কারা কেন এই পদের দৌড়ে এগিয়ে?

অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্তারা: একজন আইএএস কর্মকর্তার পুরো কর্মজীবন কাটে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় সাধন, সংকট মোকাবিলা এবং বড় বড় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। রাম মন্দিরের বিশালতা ও জাতীয় গুরুত্বের কারণে এখানে কাজ করাটা তাঁদের কেরিয়ারের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হতে পারে। অন্যদিকে, প্রাক্তন আইপিএস কর্তারা বিশাল জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, ভিআইপি মুভমেন্ট এবং বহুমুখী নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগাতে পারেন। যেমন—প্রাক্তন আইপিএস রাজেশ পান্ডের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা পুলিশ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সিদ্ধহস্ত।

প্রাক্তন সামরিক কর্তারা: শৃঙ্খলা, রসদ সরবরাহ এবং কঠিন পরিস্থিতিতে বিপুল জনসমুদ্র সামলানোর ক্ষেত্রে প্রাক্তন সেনা আধিকারিকদের জুড়ি মেলা ভার। তবে মন্দির ট্রাস্টের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং সরকারি আমলাতন্ত্রের কর্মপদ্ধতির ফারাক সামলানো তাঁদের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জের হতে পারে।

কর্পোরেট পেশাজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা: মন্দিরের সিইও-কে ট্রাস্টের সদস্য, সাধু-সন্ন্যাসী, সরকারি ও পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ তীর্থযাত্রীদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। শুধু হুকুম দিয়ে এখানে কাজ চালানো সম্ভব নয়। এখানেই এগিয়ে থাকছেন কর্পোরেট জগতের মানুষেরা। ডিজিটাল অনুদান, উন্নত দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা, ডেটা সিস্টেম, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সামলাতে তাঁদের জুড়ি নেই।

চ্যালেঞ্জটা ঠিক কোথায়?
সাম্প্রতিক কিছু অনুদান সংক্রান্ত বিতর্ক মন্দির ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক তদারকির ওপর কড়া নজর রাখার প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। নতুন সিইও-র সাফল্য কেবল কত জন তীর্থযাত্রী সামলানো গেল তার ওপর নির্ভর করবে না, বরং মন্দিরের সম্পদ রক্ষা এবং ভক্তদের আস্থা অটুট রাখাই হবে আসল পরীক্ষা।

সব মিলিয়ে, অযোধ্যার রাম মন্দিরের প্রথম পূর্ণকালীন সিইও নিয়োগের এই লড়াই আসলে এটিই নির্ধারণ করবে যে ভবিষ্যৎ রাম মন্দির কেমন হবে—একটি পেশাদারভাবে পরিচালিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, একটি আধুনিক জনমুখী সংস্থা, নাকি ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *