স্বাস্থ্যকেন্দ্র না ভূতের বাংলো? জঙ্গল ও সাপের উপদ্রবে বেহাল দশায় ধুঁকছে চিকিৎসালয়!

চারপাশে ঘন জঙ্গল, পার্থেনিয়ামের বাড়বাড়ন্ত আর বিষাক্ত সাপের উপদ্রব। চিকিৎসক ও নার্সদের থাকার পুরনো আবাসনগুলির কোথাও দরজা-জানালা ভাঙা, আবার কোথাও পুরো ভবনটি আগাছায় সম্পূর্ণ ঢেকে গিয়েছে। দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এটি কোনো আস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র নাকি আস্ত এক ভূতের বাংলো! পশ্চিম বর্ধমান জেলার কাঁকসার বিদবিহারের শিবপুর এবং মলানদিঘি—এই দুটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বর্তমান বেহাল ছবি দেখলে যে কারোর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাত্র কয়েক বছর আগেও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির চিত্রটা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। ঝাঁ চকচকে এই হাসপাতালগুলিতে সবসময় রোগীর ভিড় লেগেই থাকত। প্রসব থেকে শুরু করে দুর্ঘটনায় আহত বা অসুস্থ মানুষদের ভর্তি রেখে নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হতো। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অযত্ন আর অবহেলায় সেই ছবিটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। বর্তমানে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি সপ্তাহের মাত্র দু’তিন দিন ও দিনের মোটে কয়েক ঘণ্টার জন্য খোলা থাকে। বাকি সময় পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।

চিকিৎসার জন্য ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি

স্থানীয়দের কথায়, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসক ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক থাকলেও নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা মেলে না। ফলে জরুরি প্রয়োজনে বিদবিহার ও মলানদিঘি এলাকার হাজার হাজার মানুষকে বাধ্য হয়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালে ছুটতে হয়। রাতের দিকে এই সমস্যা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। রাতে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে যাতায়াতের জন্য গাড়ি পাওয়া যায় না, আবার সবসময় সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও জোটে না। এর ফলে গরিব ও প্রান্তিক পরিবারের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

এলাকার বাসিন্দা গণেশচন্দ্র মণ্ডল ও রাজনারায়ণ কেসের ক্ষোভ, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির ওপর প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার মানুষ নির্ভর করে থাকেন। একাধিকবার স্বাস্থ্য দফতরের কাছে চিঠি দিয়েও কোনো সুরাহা মেলেনি। স্থানীয়দের জোরালো দাবি, নতুন বড় হাসপাতাল তৈরির আগে এই প্রাচীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকেই অবিলম্বে সংস্কার করা হোক। নিয়মিত চিকিৎসক, পর্যাপ্ত ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসার পাশাপাশি যাতে রাতেও মানুষ পরিষেবা পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা।

প্রশাসনের বক্তব্য

এই বিষয়ে মলানদিঘি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসার চিকিৎসক রাজীবকুমার মণ্ডল জানিয়েছেন যে, একসময়ে এখানে বেডের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে তা নেই। তবে তাঁরা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সাধ্যমতো মানুষকে পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের তরফ থেকেও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এই বেহাল দশার জন্য পূর্বের প্রশাসনকেই দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, এই সমস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবক্ষয় রোধে এবং ভালো অবস্থা ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এখন দেখার, জঙ্গল ও অবহেলায় ঢাকা এই দুই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভাগ্যে কবে সুদিন ফেরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *