সুবর্ণরেখার গ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রাম! করবনিয়ায় স্কুল-মন্দির বাঁচাতে হাহাকার, আতঙ্কে ঘুম উড়েছে ৩০০ পরিবারের

“নদীর পাড়ে বাস যার, আতঙ্ক তার বারো মাস”—বর্ষা এলেই এই প্রবাদ যেন চরম বাস্তব হয়ে ওঠে নদীপাড়ের মানুষের জীবনে। সুবর্ণরেখা নদীর জলস্তর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্রতর হচ্ছে ভাঙনের ভয়াবহতা। পশ্চিম মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর-১ নম্বর ব্লকের করবনিয়া গ্রামের প্রায় ৩০০টি পরিবার এখন দিন কাটাচ্ছেন এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে—এই বুঝি সব ভেসে গেল!
বর্ষার শুরু থেকেই সুবর্ণরেখার পাড়ে ভাঙন ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের। ইতিমধ্যেই বিঘার পর বিঘা চাষের জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। নদীর জলস্তর বেড়ে বসতবাড়ি ও পরিকাঠামোর অনেকটা কাছে এগিয়ে এসেছে। আর তার জেরে শুধু কৃষিজমিই নয়, এখন বিপদের মুখে পড়েছে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্কুল, জল পাম্প ও মন্দির। বিশেষ করে করবনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি পানীয় জলের পাম্প এবং নদীপাড়ের একটি শিবমন্দির এখন ভাঙনের আশঙ্কায় প্রহর গুনছে।
করবনিয়া গ্রামের বহু পরিবার কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। গ্রামের একটি বড় অংশের বাসিন্দা তপসিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের কাছে চাষের জমিই জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। একের পর এক জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় শুধু সম্পত্তির ক্ষতি নয়, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই নদীভাঙনের সমস্যা বাড়ে, কিন্তু এবার পরিস্থিতি যেন সব রেকর্ড ছাপিয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর পাড় ক্রমশ বসে যাওয়ায় বাড়িঘর নিয়েও মানুষ ঘুমহীন রাত কাটাচ্ছেন। রাতের অন্ধকারে নদীর জলের গর্জন আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গ্রামবাসীর মতে, প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, তবে আগামী দিনে বহু বসতবাড়ি নদীর গ্রাসে চলে যাবে।
সব থেকে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে করবনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে। গ্রামের শিশুদের শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এই স্কুলটি। ভাঙন যে গতিতে এগিয়ে আসছে, তাতে স্কুলবাড়িটিও আর নিরাপদ কি না, তা নিয়ে চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আক্ষেপ, দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যার কথা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জানানো হলেও আজও মেলেনি কোনো স্থায়ী সমাধান। বর্ষার সময় পরিস্থিতি জটিল হলে প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে ঠিকই, কিন্তু নদীভাঙন রোধে মজবুত বাঁধ বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় সমস্যাটি থেকেই যাচ্ছে।
গ্রামবাসীরা এখন প্রশাসনের কাছে দ্রুত সুবর্ণরেখার পাড়ে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা, এখনই পাড় সংরক্ষণের কাজ শুরু না হলে আগামী দিনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। কৃষিজমি হারানোর পাশাপাশি স্কুল, মন্দির, পানীয় জলের পরিকাঠামো এবং বসতবাড়িগুলো চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে মানচিত্র থেকে। প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে গ্রাম ও গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক—এটাই এখন করবনিয়ার মানুষের একমাত্র দাবি।