‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা…’, যাঁর গানে উদ্বেল হয়েছিল দেশ, আজ ধুলোয় মিশল তাঁরই শেষ স্মৃতি!

১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট। স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোরে লালকেল্লায় তেরঙা তুলছেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। আর ঠিক সেই সময়ে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর (All India Radio) তরঙ্গে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এক বাঙালি তরুণীর সুরেলা কণ্ঠ— ‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা…’। স্বাধীন ভারতের প্রথম সেই সকালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যাঁর কণ্ঠস্বর, সেই যূথিকা রায় আজ বিস্মৃতির অতলে। ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে যখন দেশজুড়ে উন্মাদনা, তখন নীরবেই কলকাতার বুক থেকে মুছে গেল এই কিংবদন্তি শিল্পীর শেষ স্মৃতিটুকুও।

নেহরুর সেই বিশেষ অনুরোধ ও এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত

দিনটি ছিল ১৫ অগস্ট, ১৯৪৭। দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর সদর দপ্তরে ভোরের অধিবেশনে গান গেয়ে সবে বেরোচ্ছেন যূথিকা। এমন সময় এক কর্মী ছুটতে ছুটতে এসে তাঁকে একটি বিশেষ বার্তা দেন। বার্তাটি ছিল খোদ পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছিলেন, তিনি যতক্ষণ না লালকেল্লায় পৌঁছচ্ছেন এবং লাহোর গেটের সামনে তেরঙা পতাকা উত্তোলন করছেন, যূথিকা যেন তাঁর গান চালিয়ে যান।

সেই অনুরোধ রেখেই ইথার তরঙ্গে যূথিকা গেয়ে উঠেছিলেন ‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা, সোনে কা হিন্দুস্তান…’। সঙ্গে ছিল ভজন। স্বাধীন ভারতের সেই প্রথম সকালের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিলেন এই বাঙালি গায়িকা। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে মনে রাখেনি।

মাত্র ১৪ বছরেই স্টারডম, মুগ্ধ হয়েছিলেন স্বয়ং নজরুল

হাওড়ার আমতায় জন্ম যূথিকা রায়ের। ডাকনাম ছিল ‘রেণু’। মা-বাবার ইচ্ছেতেই গানের জগতে পা রাখা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে গ্রামাফোন কোম্পানির স্টুডিয়োতে সুরকার কমল দাশগুপ্ত এবং গীতিকার প্রণব রায়ের সামনে তিনি রেকর্ড করেছিলেন দুটি গান— ‘আমি ভোরের যূথিকা’ এবং ‘সাঁঝের তারকা আমি’।

আজকের দিনে যাকে বলে ‘সুপারস্টার’, সে যুগে যূথিকা ছিলেন ঠিক তাই। মাত্র তিন মাসে তাঁর রেকর্ডের ৬০ হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল, যা সেই সময়ের নিরিখে ছিল এক অভাবনীয় রেকর্ড। তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে কাজী নজরুল ইসলামও নিজের লেখা দুটি গান তাঁকে দিয়ে রেকর্ড করিয়েছিলেন (যদিও তা পরে প্রকাশিত হয়নি)। ১৯৪০-এর দশকে হিজ মাস্টার্স ভয়েস (HMV)-এর হাত ধরে ‘ভজনওয়ালী যূথিকা’-র খ্যাতি ভারত ছাড়িয়ে পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

ধুলোয় মিশল ইতিহাস, বিস্মৃতির অতলে ‘ভজনওয়ালী’

ক্যাসেটের যুগ আসার পর নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছিলেন এই ‘গীতলক্ষ্মী’। তাঁর শেষ ঠিকানা ছিল উত্তর কলকাতার ৫ বি শ্যামপুকুর স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়ি। কয়েকটি বিড়াল, ছোট বোন আর একরাশ পুরনো স্মৃতি নিয়ে সেখানেই দিন কাটত তাঁর।

বিদেশের মাটিতে এমন একজন শিল্পীর বাড়ি নির্ঘাত মিউজিয়ামে পরিণত হতো। বসত নীল ফলক। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস-বিস্মৃতির রোগে সেই বাড়ি আজ স্রেফ ভাঙা ইট-পাথরের স্তূপ। পুরনো বাড়িটি ভেঙে সেখানে মাথা তুলছে নতুন বহুতল। শহরের ব্যস্ততার মধ্যে নিঃশব্দে ঝরে গেল ইতিহাসের এক অমূল্য চিহ্ন।

৮০তম স্বাধীনতা দিবসে হয়তো পাড়ায় পাড়ায় ফের বেজে উঠবে ‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা…’। কিন্তু সেই উদ্‌যাপনে থাকবেন না যূথিকা রায়। থাকবে না তাঁর সত্তা, তাঁর স্মৃতি, কিংবা তাঁর সেই শ্যামপুকুর স্ট্রিটের বাড়িটাও। একরাশ আক্ষেপ আর উপেক্ষার অন্ধকারে এভাবেই হারিয়ে গেলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম সকালের সেই সুর-সাধিকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *