বিশ্ব জুড়ে পেট্রল-ডিজেল নিয়ে বড় বিপদের আশঙ্কা! হরমুজ কার দখলে? ট্রাম্প বনাম ইরানের লড়াইয়ে তোলপাড়

ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনায় এবার নতুন মাত্রা যোগ হল। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি অস্ত্রের গর্জন কিছুটা কমলেও কথার লড়াই এখন চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’র (Strait of Hormuz) নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে হোয়াইট হাউস ও তেহরানের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ তুঙ্গে উঠেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক দাবির পরই দুই দেশের সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি কী?

গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট করে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তা ভবিষ্যতেও বজায় রাখা হবে। ট্রাম্প হুঙ্কার দিয়ে লেখেন, “আমরা হরমুজে একটি ইস্পাতের প্রাচীর তৈরি করেছি। ইরানের সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা নেই।”

পাশাপাশি, তেহরানকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে কোণঠাসা করার দাবিও তোলেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংসের মুখে এবং রেভলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) পলাতক। মুদ্রাস্ফীতির জেরে ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ইরানের চরম পাল্টা হুঙ্কার

ট্রাম্পের এই দাবির পরেই কড়া ভাষায় তার জবাব দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাঘচি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাকে নিশানা করে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ফের কোনো বড় ভুল হিসাব বা ‘মিস ক্যালকুলেশন’ করলে তার ফল মারাত্মক হতে পারে।

এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে এক পোস্টে আরাঘচি লেখেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভুলে আমেরিকা অতীতেও বড় ভুল করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ভুয়া গোয়েন্দা রিপোর্টের জেরে আমেরিকা যদি বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে তা ভুয়া খবরের চেয়েও বিপজ্জনক প্রমাণিত হবে। পাশাপাশি, পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ এবং বাসিজ কমান্ডার হুসেইন তায়েবও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্যে বাস্তব পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না। ইরানের স্পষ্ট শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধই থাকবে।

হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি সামুদ্রিক রুট। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ জারি থাকলে তার প্রভাব শুধু আমেরিকা বা ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যেতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই হরমুজ প্রণালীকে পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করা ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে একটি বড় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের মূল শর্তগুলি কী কী?

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌচলাচল এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার জন্য তেহরান অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত চাপিয়েছে। ইরানের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • যুদ্ধের অবিলম্বে স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।

  • মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।

  • ইরানের ওপর জারি থাকা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।

  • বিদেশে জব্দ করে রাখা সমস্ত ইরানি সম্পত্তি বা ফান্ড অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও ইরানের এই অনড় অবস্থানের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ফের এক বড় ধরণের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *