বছরে দু’বার বোর্ড পরীক্ষা থেকে মাতৃভাষায় শিক্ষা! ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরাট বদল এক নজরে

ভারত তার স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে পদার্পণ করতে চলেছে। দীর্ঘ পরাধীনতার গণ্ডি পেরিয়ে গত ৭৯ বছরে দেশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে আকাশছোঁয়া সাফল্য অর্জন করেছে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি হলো শিক্ষা। একসময় যেখানে দেশের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশের নিচে, সেখান থেকে আজকের ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলা বেশ ঘটনাবহুল। এই রূপান্তরের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা নীতি।
স্বাধীনতার সময় কেমন ছিল দেশের শিক্ষার ছবি?
১৯৪৭ সালে যখন দেশ স্বাধীন হয়, তখন দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশই ছিল অশিক্ষিত। ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা ছিল অত্যন্ত সীমিত কিছু মানুষের নাগালের মধ্যে। এমতাবস্থায় একটি নতুন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল শিক্ষার আলো সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই লক্ষ্যেই স্বাধীনতার পর সরকার একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। ১৯৫২-৫৩ সালে গঠিত হয় মাধ্যমিক शिक्षा आयोग এবং ১৯৬১ সালে পথচলা শুরু করে NCERT।
১৯৬৮: দেশের প্রথম শিক্ষা নীতি ও ঐতিহাসিক বদল
কোঠारी কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৬৮ সালে দেশ পায় প্রথম জাতীয় শিক্ষা নীতি। এই নীতির হাত ধরেই শিক্ষাকে জাতীয় গুরুত্বের বিষয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
-
শিক্ষাখাতে কেন্দ্রীয় বাজেটের ৬ শতাংশ খরচ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়।
-
১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সমস্ত শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।
-
তবে এই নীতিতেই প্রথম মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের বিজ্ঞান ও গণিত পড়ার সুযোগ দিয়ে সমতার বার্তা দেওয়া হয়, যা পূর্বে হোম সায়েন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯৮৬: দ্বিতীয় শিক্ষা নীতি এবং পরিকাঠামোর উন্নয়ন
১৯৮৬ সালে আসে দেশের দ্বিতীয় শিক্ষা নীতি, যাতে ১৯৯২ সালে কিছু সংশোধন করা হয়। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী, এসসি এবং এসটি সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া।
-
প্রাথমিক স্কুলগুলির মানোন্নয়নে চালু হয় ‘অপারেশন ব্ল্যাকবোর্ড’।
-
দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের কথা মাথায় রেখে চালু হয় ‘মিড ডে মিল’ বা মধ্যাহ্নভোজন প্রকল্প।
-
জেఈই (JEE) এবং এআইইইই (AIEEE)-র মতো সর্বভারতীয় স্তরে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা পরীক্ষার রূপরেখা তৈরি হয় এই সময়ই।
২০২০: নতুন শিক্ষা নীতি এবং একবিংশ শতকের আধুনিক রূপান্তর
স্বাধীন ভারতে এ পর্যন্ত তিনটি শিক্ষা নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষটি হলো ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP 2020)। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে প্রথাগত পড়াশোনার ছক ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
-
পুরনো ১০+২ কাঠামোর বদলে আনা হয়েছে নতুন ৫+৩+৩+৪ শিক্ষাক্রম।
-
পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠন মাতৃভাষা বা স্থানীয় ভাষাতেই করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
-
চাপ কমাতে এখন থেকে বছরে দুই বার বোর্ড পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
-
স্কুলস্তর থেকেই বৃত্তিমূলক বা ভোকেশনাল শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য ‘PARAKH’ নামক জাতীয় কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত ভারতের এই শিক্ষাগত যাত্রার ইতিহাস প্রমাণ করে যে, প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে একটি দেশ তার তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় শক্তিশালী করে তুলেছে।