ডিজিটালাইজেশনে বদলে গেল ভারত! লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করানোর দিন শেষ, কীভাবে ঘুরল চাকা?

কাগজপত্রের স্তূপ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং সরকারি দফতরে বারবার চক্কর কাটার দিন ক্রমশ অতীত। গত এক দশকেরও বেশি সময়ে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা DPI-এর বিস্তারের হাত ধরে ভারতের অর্থনীতি ও প্রশাসনে এসেছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। সরকারি দফতর থেকে শুরু করে ডিজিটাল পেমেন্ট, শিক্ষা, ক্রয় বা দক্ষতা উন্নয়ন—সর্বত্রই প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক নতুন বিপ্লব দেখছে দেশ। কেন্দ্রের দাবি, এই ডিজিটাল পরিকাঠামো সাধারণ মানুষের জীবনকে কেবল সহজই করেনি, বরং প্রশাসনকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নাগরিককেন্দ্রিক করে তুলেছে।
প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের জিডিপি-র প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ আসে ডিজিটাল অর্থনীতি থেকে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী দশকে এই হার পৌঁছে যেতে পারে ২০ শতাংশে। ‘স্টেট অফ ইন্ডিয়া’স ডিজিটাল ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৬’ জানাচ্ছে, ভারত বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জি-২০ দেশগুলির মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে।
ইলেকট্রনিক্স ও মোবাইল উৎপাদনে বিরাট লাফ
ডিজিটাল পরিকাঠামোর পাশাপাশি দেশীয় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনেও অভূতপূর্ব বৃদ্ধি ঘটেছে। পিএলআই, ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাকটর মিশন এবং ইএমসি ২.০-এর মতো সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপে ভর করে ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষের ১.৯ লক্ষ কোটি টাকার উৎপাদন বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে দাঁড়িয়েছে ১৩.১১ লক্ষ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক পণ্যের রফতানি ৩৮ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪.২৪ লক্ষ কোটি টাকা। বর্তমানে এই ক্ষেত্রটি প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, যার প্রায় ৩০ শতাংশই মহিলা।
মোবাইল ফোন উৎপাদনেও এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। ২০১৪-১৫ সালের ১৮ হাজার কোটি টাকার উৎপাদন বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে ৬.২৭ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, মোবাইল উৎপাদন ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ কাজ করছেন, যার প্রায় ৭০ শতাংশই নারী শক্তি।
সস্তা ডেটা এবং কানেক্টিভিটিতে বিশ্বজয়
টেলিকম ক্ষেত্রেও গত এক দশকে ভারতের অগ্রগতি চোখ ধাঁধানো। ২০১৪ সালে দেশে মোট টেলিফোন সংযোগ ছিল ৯৩.৩ কোটি, যা ২০২৬ সালের জুনে ১৩৪.৮ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ২৫.১৫ কোটি থেকে বেড়ে ১০৯ কোটি পেরিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, মোবাইল ডেটার দাম আকাশছোঁয়া থেকে নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের নাগালে। ২০১৪ সালে প্রতি জিবি ডেটার দাম যেখানে ছিল ৩০৮ টাকা, তা কমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭.৫১ টাকায়। পাশাপাশি, দেশের ৯৯.৯ শতাংশ জেলায় পৌঁছে গেছে ৫জি পরিষেবা।
UPI-এর হাত ধরে আর্থিক লেনদেনে বিপ্লব
নোটবন্দি পরবর্তী সময়ে দেশের আর্থিক লেনদেনের ছবিটাই বদলে দিয়েছে ইউপিআই বা UPI। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ইউপিআই-এর মাধ্যমে ২৪ হাজার কোটিরও বেশি লেনদেন হয়েছে, যার মোট আর্থিক মূল্য ৩১৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে সাড়ে ৫৫ কোটির বেশি নাগরিক এবং সাড়ে ছয় কোটি ব্যবসায়ী এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ভারতের মোট ডিজিটাল পেমেন্টের প্রায় ৮৫ শতাংশই এখন হয় ইউপিআই মারফত। শুধু দেশেই নয়, কম্বোডিয়া, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, ইউএই এবং মরিশাসের মতো ১১টি দেশেও এখন ইউপিআই-এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
সরকারি পরিষেবা এখন হাতের মুঠোয়
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কল্যাণে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে প্রশাসনিক পরিষেবা। ডিজিটকার, উমং, আধার এবং কমন সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে লাইনে দাঁড়ানোর ঝক্কি কমেছে। ডিপ্রশাসনকে আরও গতিশীল করতে ডিভিসিএল বা ডিবিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে প্রকল্পের টাকা। শিক্ষা ক্ষেত্রে দীক্ষা, স্বয়ম এবং এপার আইডি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, ওএনডিসি এবং জেম পোর্টাল দেশের বাণিজ্য ও সরকারি কেনাকাটায় এনেছে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা। সবমিলিয়ে, প্রযুক্তির হাত ধরে এক নতুন এবং আত্মনির্ভর ভারতের শক্ত ভিত তৈরি হচ্ছে।