উচ্চশিক্ষা থেকে ইন্টারনেট! বিহারের গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে দিতে একলপ্তে ১০টি মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দিল সরকার

গ্রামাঞ্চলে যুবসমাজকে শিক্ষিত করে তোলা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সংযোগের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে একগুচ্ছ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিহার সরকার। গত ১২ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার বৈঠকে শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন শক্তি ও ইন্টারনেট সংযোগ সংক্রান্ত মোট ১০টি বড় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। রাজ্যের সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি এবং উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করতেই এই মেগা পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহল মহল।
উচ্চশিক্ষার প্রসারে ৩০০ নতুন ডিগ্রি কলেজ
রাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বেশি সংখ্যক যুবকের কাছে পৌঁছে দিতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় শুধুমাত্র বি.এড. কোর্স প্রদানকারী বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্টস, সায়েন্স, কমার্স ও ভোকেশনাল বিষয়ে ডিগ্রি কোর্স চালুর সুযোগ দেওয়া হবে। এর ফলে রাজ্যে প্রায় ৩০০টি নতুন ডিগ্রি কলেজ গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে, যা পুরোপুরি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
পাশাপাশি, রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড স্কিমটি’ আগামী পাঁচ বছর অর্থাৎ ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবর্ষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র ২০২৬-২৭ সালের জন্যই ৯৫০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন করেছে সরকার, যা উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সাহায্যপ্রার্থী তরুণ-তরুণীদের বড় সহায়তা করবে।
প্রতিটি গ্রামে হাই-স্পিড ফাইবার ইন্টারনেট
ভারতনেট প্রকল্পের কাজ আরও ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি গ্রাম ও পঞ্চায়েতের সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন— স্কুল, থানা, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, ডাকঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিকে উচ্চ-গতির ফাইবার ইন্টারনেটের আওতায় আনা হবে। নেটওয়ার্কের আপটাইম ৯৯ শতাংশ রাখার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। এর ফলে গ্রামীণ এলাকায় ডিজিটাল পরিষেবা, অনলাইন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো আরও বেশি শক্তিশালী হবে।
এআই ও ড্রোন প্রযুক্তিতে যুবকদের প্রশিক্ষণ
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে ‘দক্ষ যুব কর্মসূচি’ আরও পাঁচ বছরের জন্য অর্থাৎ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০-২৬-২৭ অর্থবর্ষে এই খাতে ৪৩০.০৮ কোটি টাকা খরচ করা হবে। আধুনিক যুগের চাহিদার কথা মাথায় রেখে যুবকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্রোন প্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং, ব্যাংকিং, কোডিং এবং সৌরশক্তির মতো আধুনিক ও ট্রেন্ডিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই উদ্দেশ্যে রাজ্যজুড়ে ৬,৪৩৬টি নতুন কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখান থেকে প্রতি বছর প্রায় ২.৫৭ লক্ষ যুবক উপকৃত হবেন।
স্বচ্ছ্বতা ও পরিচ্ছন্ন শক্তিতে জোর
বেসরকারি আইটিআই (ITI) প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্বচ্ছ ভর্তি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বিসিইসিইবি-র মাধ্যমে মোট আসনের ৫০ শতাংশে সেন্ট্রালাইজড ভর্তির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনে গয়া, মুজাফফরপুর, ভাগলপুর এবং বিহার শরিফে সংকুচিত বায়োগ্যাস (CBG) প্ল্যান্ট গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট পৌর সংস্থাগুলিকে ২৫ বছরের জন্য বিনামূল্যে ১০ একর জমি দেওয়া হবে, যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বড় ভূমিকা নেবে।
এছাড়া, ‘প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর যোজনার’ আওতায় বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসাতে কেন্দ্রীয় সহায়তার পাশাপাশি রাজ্য সরকার প্রতি কিলোওয়াটে অতিরিক্ত ১০,০০০ টাকা (সর্বোচ্চ ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত) অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই খাতে ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, মন্ত্রিসভার এই বহুমুখী সিদ্ধান্তগুলো বিহারের শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের মানচিত্রে এক বিরাট পরিবর্তন আনবে বলেই আশা করা হচ্ছে।