CJP-র মতো হবে না তো? ছাত্রদের অনশন আন্দোলনে উত্তাল ঝাড়খণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদন: NEET পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শোরগোলের পর, এবার সরকারি চাকরি পরীক্ষার দুর্নীতির জেরে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে ঝাড়খণ্ডে। ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (JSSC) কম্বাইন্ড গ্র্যাজুয়েট লেভেল (CGL) পরীক্ষায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা নেমেছেন ছাত্র-ছাত্রীরা। গত ১৭ দিন ধরে রাঁচিতে লাগাতার ধর্না ও অনশন চলছে। সরকারের সঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সোমবার ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ভবন অভিযানের ডাক দেন আন্দোলনকারীরা। এই পরিস্থিতির মধ্যেই গোটা রাঁচি শহরজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়েরের ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

অনড় পড়ুয়ারা, ভেস্তে গেল সরকারের সঙ্গে বৈঠক

রবিবারই আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছিল হেমন্ত সোরেন সরকার। কিন্তু সেই আলোচনা কোনো ইতিবাচক ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়। আন্দোলনকারী ছাত্রনেতা সঞ্জয় মেহতার স্পষ্ট ঘোষণা, সরকার তাদের ১০০ শতাংশ দাবি না মানা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। ঝাড়খণ্ডের সমস্ত জেলা থেকে চাকরিপ্রার্থীরা নৈতিক সমর্থন জানিয়ে পুরনো বিধানসভা ভবন থেকে নতুন বিধানসভা ভবন পর্যন্ত এই শান্তিপূণ বিশাল মিছিলে পা মেলাচ্ছেন।

ছাত্রদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • চলতি বছরের JSSC-CGL পরীক্ষা অবিলম্বে বাতিল করা।

  • পুরো দুর্নীতির তদন্তভার সিবিআই (CBI)-এর হাতে তুলে দেওয়া।

  • চাকরির পরীক্ষার সামগ্রিক মডেলে কাঠামোগত সংস্কার আনা।

আমরণ অনশনে বসেছেন ঝাড়খণ্ডের ‘সোনম ওয়াংচুক’

গত ৮ দিন ধরে জীবন বাজি রেখে আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। রাঁচির এই আন্দোলনকে ঘিরে তিনি এখন ঝাড়খণ্ডের ‘সোনম ওয়াংচুক’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। অনশনের জেরে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছে (ওজন কমেছে ১০ কেজি, রক্তে শর্করার মাত্রাও নিম্নমুখী)। প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও দেবেন্দ্রর সাফ কথা, “প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া এবং মেধাবী পড়ুয়াদের চাকরি থেকে বঞ্চিত হতে দেখার যন্ত্রণা শরীরের এই কষ্টের চেয়ে অনেক বেশি।” দেবেন্দ্র ছাড়াও আরও ৬ জন ছাত্র এই আমরণ অনশনে অংশ নিয়েছেন।

সরকারের পদক্ষেপ ও ইডি-র এন্ট্রি

ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে পড়ে বেশ কিছু প্রস্তাব ও দাবি মেনে নিয়েছে হেমন্ত সোরেনের সরকার। উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী সুদিব্য কুমার জানিয়েছেন, সরকার ইতিমধ্যে একাধিক বড় পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে:

  1. ১৪তম JPSC পরীক্ষা বাতিল: ছাত্রছাত্রীদের দাবির মুখে এই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  2. ED তদন্তের প্রস্তাব: JPSC পরীক্ষায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইডি-র তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।

  3. ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত: পরীক্ষায় অনিয়মের মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠন এবং ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট পেশের প্রস্তাব।

  4. বিশেষজ্ঞ কমিটি: পরীক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনতে IIT-ISM ধানবাদ, IIM রাঁচি এবং XLRI জামশেদপুরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে এত কিছুর পরেও সিবিআই তদন্ত এবং পরীক্ষা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে অনড় রয়েছেন পড়ুয়ারা। এদিকে, এই দুর্নীতির তদন্তে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা দায়ের করায় চাপ আরও বেড়েছে সরকারের ওপর।

রাঁচিজুড়ে ব্যারিকেড ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা

পড়ুয়াদের বিধানসভা অভিযানকে কেন্দ্র করে রাঁচি পুলিশ চরম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। বিধানসভা চত্বরের ৭৫০ মিটারের মধ্যে ৬ থেকে ১২ অগস্ট পর্যন্ত (প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত) কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলিতে বসানো হয়েছে কাঁটাতারের ব্যারিকেড। পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হলেও আন্দোলনকারীদের দাবি, সমাজবিরোধী বা উচ্ছৃঙ্খল কোনো উপাদান যাতে এই শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনে ঢুকে পড়তে না পারে, সেদিকেও কড়া নজর রাখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটিয়ে পড়ুয়ারা তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে শান্তিপূর্ণ পথেই অনড় রয়েছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *