চিনের এক চালে থমকে যাবে ভারতের উৎপাদন? মোবাইল-গাড়ি বাজারে বিরাট ধসের আশঙ্কা!

দেশের অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া স্মার্টফোন, টেলিভিশন এবং বিভিন্ন চারচাকার গাড়ির কারখানাগুলিতে বর্তমানে এক চরম অস্বস্তিকর এবং অদ্ভুত আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই সংকটের পেছনে ভারতের নিজস্ব কোনো অভ্যন্তরীণ জটিলতা নেই, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চিনের এক সুকৌশলী নতুন চাল। সাম্প্রতিককালে চিন সরকার ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বাণিজ্যিক ভিসা বা বিজনেস ভিসার হার মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। যার সরাসরি ও সুদূরপ্রসারী নেবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের মূল উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরের ওপর। এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অদূর ভবিষ্যতে বাজারে মোবাইল-ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম থেকে শুরু করে গাড়ি পর্যন্ত সবকিছুরই প্রবল ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আর তার জেরে উৎপাদন খরচ ও জোগান হ্রাসের চাপ সরাসরি গিয়ে পড়বে সাধারণ ক্রেতার পকেটে।
৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ভিসা বাতিল!
গত কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চিন সফরে ইচ্ছুক ভারতীয় পেশাদার ও আধিকারিকদের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভিসার আবেদন সরাসরি বাতিল করা হচ্ছে। অতীতে যেখানে ব্যবসায়িক ভিসা অত্যন্ত সহজে পাওয়া যেত, বর্তমানে চিন মাত্র ২০ থেকে ৪০ শতাংশ আবেদনকে ছাড়পত্র দিচ্ছে। ইলেকট্রনিক্স এবং অটোমোবাইল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শীর্ষ আধিকারিকরা জানিয়েছেন যে, এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি এখন অত্যন্ত দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একবার আবেদন বাতিল হলে পুনরায় নতুন করে কাগজপত্র জমা দিলেও ভিসা মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ থাকছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত ভিসা রিজেক্ট হওয়ার বিষয়ে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছেন।
চিনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতাই কাল?
বাস্তব ক্ষেত্রে, ভারত তার দেশের বেশ কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পক্ষেত্রে উন্নত যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ বা পার্টস এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য আজও চিনের ওপর মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল। বিভিন্ন শিল্প সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং যন্ত্রাংশ চিন থেকেই আমদানি করা হয়। ফলস্বরূপ, ভারতীয় টেকনিশিয়ানরা সময়মতো চিন ভ্রমণ করে যন্ত্রপাতি বা কাঁচামালের মান যাচাই করতে না পারলে দেশীয় প্রোডাকশন প্রজেক্টগুলিতে বড় ধরনের বিলম্ব ঘটবে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টর জানিয়েছেন যে, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার কারণে কারখানাগুলির স্বাভাবিক উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধির জন্ম দেবে।
নেপথ্যে কি পুরনো প্রতিশোধের আগুন?
এই লাগাতার আর্থিক ক্ষতি ও বাধার মুখে পড়ে দেশের বহু নামী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় ও অনানুষ্ঠানিক উপায়ে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারস্থ হয়েছে। শিল্পমহলের স্পষ্ট দাবি, উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক স্তরে এই সংবেদনশীল বিষয়টি দ্রুত চিনের নজরে আনা উচিত। ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘটিত সামরিক সংঘর্ষের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। সেসময় ভারত চিনা লগ্নির ওপর ‘প্রেস নোট ৩’-এর মতো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং চিনা নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি নীতি নেয়। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চিন এখন ভারতীয় ব্যবসায়ীদের ভিসা আটকে দিয়ে মূলত সেই পুরোনো কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কঠোরতারই প্রতিশোধ নিতে চাইছে। তবে এই সম্পূর্ণ বিতর্কিত বিষয়টিতে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত চিনা দূতাবাস এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ রহস্যজনক নীরবতা বজায় রেখেছে।