‘নমামি গঙ্গে’র হাজার হাজার কোটি গেল কোথায়? গঙ্গা ও উপনদীতে বর্জ্য ফেলা নিয়ে বিহার সরকারকে এনজিটি-র কড়া বার্তা

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পের অধীনে গঙ্গা ও তার উপনদীগুলি পরিষ্কার করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও বাস্তবে চিত্রটা একেবারেই অন্যরকম। বহু নগর স্থানীয় সংস্থা বা মিউনিসিপ্যাল বডির চরম অবহেলায় এখনও সরাসরি অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই গুরুতর পরিবেশগত অপরাধের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি)। ট্রাইব্যুনাল সরাসরি বিহার রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডকে (BSPCB) এই দায়িত্বজ্ঞানহীন সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ বা মোটা অঙ্কের জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।

নদীগুলির দূষণ ও আশঙ্কাজনক চিত্র
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই মামলার শুনানি করছে এনজিটি। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারপার্সন বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তব এবং বিশেষজ্ঞ সদস্য আফরোজ আহমেদ-এর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জানিয়েছে যে, বিহারের ২৭টি জেলার গঙ্গা, সোন, কোসি এবং বাগমতীর মতো প্রধান নদীগুলির জল এতটাই দূষিত হয়ে পড়েছে যে তা আর স্নানের উপযুক্তও নেই। জলের মধ্যে ক্ষতিকর ‘ফেকাল কলিফর্ম’-এর মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এসটিপি (STP) পরিকাঠামোর বেহাল দশা
রাজ্য সরকারের দাখিল করা একটি হলফনামা থেকেই পরিষ্কার হয়ে গেছে বর্জ্য শোধনের ক্ষেত্রে কতটা উদাসীনতা রয়েছে:

বিহারে বর্তমানে মোট ৪৩টি পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগার (STP) রয়েছে।

এর মধ্যে মাত্র ১৫টি প্ল্যান্ট সম্পূর্ণরূপে চালু রয়েছে, এবং ৫টি চলছে পরীক্ষামূলকভাবে।

এছাড়া ৯টি প্ল্যান্ট নির্মাণাধীন, ৪টি টেন্ডার প্রক্রিয়ার অধীনে এবং ১০টি ডিপিআর (DPR) পর্যায়ে রয়েছে।

শুধু তাই নয়, পাটনা সহ রাজ্যের বড় শহরগুলি থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। হলফনামা অনুযায়ী:

পাটনা: ১৫টি নালা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৪.৯ কোটি লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য গঙ্গায় পড়ছে।

বক্সার: ৫.০ কোটি লিটার।

আরা: ৪.৭ কোটি লিটার।

জামালপুর: ২.৫ কোটি লিটার।

বড়ৌনি: ২.৩ কোটি লিটার।

পাশাপাশি, ডুমরাওন ও বারহিয়ার মতো অঞ্চলের নালাগুলি এখনও মূল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত না হওয়ায় দূষণের সমস্যা দিন দিন আরও বাড়ছে।

এনজিটি-র কড়া নির্দেশ ও পরবর্তী শুনানি
ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন তুলেছে যে, অনেক জায়গায় বৃষ্টির জল নিষ্কাশনের নালা (Storm water drain) দিয়ে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। সমন্বিত পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে কোন বিভাগ দায়িত্বে রয়েছে এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ আছে কি না, সে বিষয়েও জবাব চেয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

এনজিটি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, যে সমস্ত নগর সংস্থা বা স্থানীয় নিকায়ের অবহেলায় অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে মিশছে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ (জরিমানা) আরোপ করতে হবে। একই সঙ্গে এসটিপিগুলির বর্তমান কার্যকারিতা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে রাজ্য সরকারকে আগামী ১৬ই অক্টোবরের মধ্যে আদালতে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। গঙ্গা ও অন্যান্য নদীকে বাঁচাতে এনজিটি-র এই কড়া পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *